রুস্তম আলী: বিশেষ প্রতিনিধি
১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
পীরগঞ্জের জাফরপাড়ায় বিকেলের আলো তখন ঢলে পড়ছে। কবরস্থানের মাটিতে ছায়া লম্বা হচ্ছে। শহীদ আবু সাঈদের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো কথা বলছে নিচু গলায়—রাজনীতি, নির্বাচন, অনিশ্চয়তা। এই নীরবতার ভেতরেই জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়ালেন। কথাগুলো ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু ইঙ্গিত ছিল ভারী। তিনি বললেন, “যদি আগে থেকেই বোঝা যায়—কে প্রধানমন্ত্রী হবে, কোন দল জিতবে—তাহলে ১১ দলীয় জোট যেকোনো সময় যেকোনো ধরনের কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত।”
কথার ভেতর কোনো উত্তেজনা ছিল না। ছিল হিসাবি সতর্কতা। যেন অনেক দূর থেকে দেখা এক ঝড়ের কথা বলা হচ্ছে—এখনও আকাশ ভাঙেনি, কিন্তু মেঘ জমেছে।
আসিফ মাহমুদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাঠপর্যায় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত বিরোধী দলগুলোর মধ্যে “কমন আন্ডারস্ট্যান্ডিং” তৈরি হয়েছে। নির্বাচন যদি কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়ায়—তাহলে প্রতিক্রিয়া আসবে। কী ধরনের প্রতিক্রিয়া? তিনি বিস্তারিত বলেননি। শুধু বললেন, “কঠোর।” এরপর তিনি ইঙ্গিত করলেন বিএনপির দিকে। সরাসরি নাম নিলেন না, কিন্তু বাক্য স্পষ্ট ছিল।
“অনেক ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট দলকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে,” বললেন তিনি। “আমরা দেখেছি সংঘর্ষ হচ্ছে। কোথাও জামায়াতে ইসলামীর একজন উপজেলা সেক্রেটারিকে হত্যা করা হয়েছে।’ এসব ঘটনার পরও ১১ দলীয় জোট এখন পর্যন্ত ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি অবজারভ করছে।’
ধৈর্য—এ শব্দটি তিনি দু’বার ব্যবহার করলেন। প্রশ্ন উঠছে, এই ধৈর্যের সীমা কোথায়?
নির্বাচনে বাধার প্রসঙ্গ এলে আসিফ মাহমুদের কণ্ঠ আরও সরল হয়ে আসে। নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে তাঁর সন্দেহ নতুন নয়।
“আমরা আগেও বলেছি,” তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই মাঠপর্যায়ে আমরা দেখছি—কন্ট্রোলের জায়গাটা আদর্শ অবস্থায় নেই।
এখানে অভিযোগের চেয়ে পর্যবেক্ষণ বেশি। যেন একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলছেন—যা হওয়ার কথা ছিল, তা হচ্ছে না।
গণভোট প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য ‘না’ ভোটের প্রচারণা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি তা উড়িয়ে দেন।
“তাতে কিছু আসে যায় না,” বলেন তিনি। ‘গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক।’ তাঁর দাবি, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ দলই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে। সরকারও তাই।
তিনি সার্ভের কথা বলেন। সংখ্যার কথা বলেন। বলেন, ‘হ্যাঁ’ভোট অনেক এগিয়ে। কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বেশি জোর দেন মানুষের অংশগ্রহণে।
“এই অংশগ্রহণই বিপুল ম্যান্ডেট,” বলেন তিনি। ‘সংস্কারের প্রক্রিয়া এতে আরও পাকাপোক্ত হবে।’
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের বক্তব্য—এনপিপি, জামায়াত ও সরকার একই অবস্থানে—এই মন্তব্যে আসিফ মাহমুদের প্রতিক্রিয়া ছিল আরও কঠোর।
“দিল্লির কোনো পার্টির কথা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আর প্রাসঙ্গিক নয়, বলেন তিনি। ” যারা দিল্লিতে গিয়ে কী কথা হয়েছে বলা যায় না—এভাবে রাজনীতি করে, তাদের বক্তব্য ধর্তব্য নয়।
কথাগুলো বলার সময় তাঁর মুখে কোনো হাসি ছিল না। আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা নেতাকর্মীরাও চুপচাপ শুনছিলেন। দিন শেষে প্রশ্ন থেকেই যায়। নির্বাচন কি সত্যিই প্রতিযোগিতামূলক হবে, নাকি ফল আগে থেকেই লেখা? ধৈর্যের যে কথা বলা হচ্ছে, তা কি শেষ পর্যন্ত টিকবে? আর যদি “কঠোর সিদ্ধান্ত” আসে—তার মূল্য দেবে কে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও বাতাসে ঝুলে আছে।