আব্দুস সামাদ আজাদ
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, গত ১৫–১৬ বছরে দেশে নির্বাচনের নামে একের পর এক তামাশা হয়েছে। কখনো ডামি নির্বাচন, কখনো নিশিরাতের নির্বাচন, আবার কখনো ভোট চুরির নির্বাচন হয়েছে। এসব তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণকে ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
সমাবেশে তিনি বলেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এ দেশ থেকে একটি দল পালিয়ে গেছে। তারা গত দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছিল, কথা বলার অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে গুম করা হয়েছে, গায়েবি মামলা দেওয়া হয়েছে, মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে, এমনকি হত্যা করা হয়েছে। সারা দেশে এরকম হাজার হাজার ঘটনা ঘটেছে।”
তারেক রহমান অভিযোগ করেন, শুধু মানুষের ভোট ও বাকস্বাধীনতা হরণই নয়, এই চক্র দেশের অর্থ-সম্পদ লুটপাট করে বিদেশে পাচার করেছে। এর ফলেই গত ১৫ বছরে এই এলাকায় কোনো মেডিকেল কলেজ হয়নি, হাসপাতালের উন্নয়ন হয়নি, রাস্তাঘাটের অবস্থাও শোচনীয় হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সরকার আমলে (২০০১–২০০৬) অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান এই এলাকার উন্নয়নে বহু প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছিলেন। কিন্তু ২০০৮ সালের ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শক্তি ক্ষমতা দখলের পর মানুষের উন্নয়ন বন্ধ হয়ে যায়। কারণ তখন জনগণের ভোটাধিকার ও কথা বলার অধিকার ছিল না, ফলে মানুষের দুঃখ-কষ্ট শোনার মতো কেউ ছিল না।
তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা জীবন দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলেন। পরে বিভিন্ন সময় মানুষের ভোট ও বাকস্বাধীনতা হরণের চেষ্টা হয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করেন। ১৯৯১ সালে জনগণের শক্তিতে খালেদা জিয়া সরকার গঠন করে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন, কারণ এই ব্যবস্থার মাধ্যমেই এলাকার উন্নয়ন সম্ভব।
মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফজলুর রহমান ময়ূনের সভাপতিত্বে আয়োজিত সমাবেশে তারেক রহমান বলেন, ঢাকা থেকে সিলেট আসতে এখন ৮–১০ ঘণ্টা সময় লাগে, অথচ লন্ডন যেতে এত সময় লাগে না। এটাই স্বৈরাচারী সরকারের তথাকথিত উন্নয়নের নমুনা। তিনি বলেন, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল—সবই ভেঙে পড়েছে, কারণ বছরের পর বছর লুটপাট করে টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “৭১ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের আন্দোলন, আর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছিল স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলন। এখন স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু করতে হবে, মানুষের কথা বলার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। একমাত্র ধানের শীষই এই নিশ্চয়তা দিতে পারে।” তিনি দাবি করেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে কেউ গুম-খুনের শিকার হয়নি।
এক মাস আগে বিদেশ থেকে ফিরে ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বেকার যুবকদের—শিক্ষিত, অল্প শিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত—সবার জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে তারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।
কারো নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, “একটি দল বলছে—সব দেখেছেন, এবার তাদের দেখেন। কিন্তু দেশের মানুষ ১৯৭১ সালেই তাদের ভূমিকা দেখেছে। তাই আমরা বলি—দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়; সবার আগে বাংলাদেশ।”
সমাবেশে হজ করে আসা এক প্রবীণ ব্যক্তিকে মঞ্চে তুলে ধরে তিনি বলেন, “বেহেশত ও দোজখের মালিক একমাত্র আল্লাহ। যার মালিক আল্লাহ, তা অন্য কেউ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। এসব কথা বলে যারা মানুষকে বিভ্রান্ত করছে, তারা ভয়াবহ অপরাধে লিপ্ত।” তিনি জনগণকে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, নারী সমাজকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষকদের জন্য ‘কৃষি কার্ড’, বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান এবং সিলেট অঞ্চলের বিদেশগামী তরুণদের জন্য প্রশিক্ষণ ও ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।
উল্লেখ্য, দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত থাকার পর তারেক রহমান সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে তাঁর নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। বুধবার তিনি সিলেটে পৌঁছে রাতে শ্বশুরালয়ে অবস্থান করেন।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি বলেন, “আগামী ১২ তারিখে আপনারা ধানের শীষকে বিজয়ী করলে সরকার গঠনের পর নারী সমাজের জন্য ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হবে।” তিনি আরও বলেন, বিএনপি বিশ্বাস করে—লক্ষ-লক্ষ কোটি জনতাই বিএনপির রাজনৈতিক ক্ষমতার মূল উৎস। “করবো কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ”—এই অঙ্গীকার নিয়েই বিএনপি এগিয়ে যাবে।
সমাবেশে মৌলভীবাজার জেলা ও উপজেলার বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।