
রংপুর জেলা প্রতিনিধি
১৬ এপ্রিল
সংখ্যারও এক ধরনের শোক আছে। কাগজে লেখা থাকে শুধু অঙ্ক–২০৬। কিন্তু এই সংখ্যার ভেতরে আছে ২০৬টি ঘর, ২০৬টি থেমে যাওয়া নিঃশ্বাস, ২০৬টি পরিবারের রাতভর জেগে থাকা কান্না। দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা এখন দুইশ’ পেরিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে আরও দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাম সন্দেহে মারা গেছেন আরও ছয় জন। সব মিলিয়ে ১৫ মার্চ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০৬ জন। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু ৩৪ জন, আর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ১৭২ জন। একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কখন বিপদের ভাষা বলে? যখন হাসপাতালের বারান্দা ভরে যায় জ্বরে কাঁপা শিশুর কাশিতে, যখন মায়েরা কোলে জ্বরজ্বালা সন্তান নিয়ে স্যালাইনের লাইনে দাঁড়ান, যখন ডাক্তাররা সংখ্যা গোনেন আর পরিবারগুলো মানুষ হারায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হামরোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ১৯১ জন। ১৫ মার্চ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৩৫২ জনে। নিশ্চিত রোগী গত ২৪ ঘণ্টায় ৯২ জন। আর এক মাসের কিছু বেশি সময়ে নিশ্চিত রোগী ৩ হাজার ৬৫ জন। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৩ হাজার ১২৯ জন। সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১০ হাজার ৪৯৬ জন। অর্থাৎ, হাসপাতালের দরজা দিয়ে যারা ঢুকেছেন, তাদের সবাই ঘরে ফেরেননি। কেউ ফিরেছেন দুর্বল শরীরে, কেউ ফিরেছেন শোকের কফিনে, কেউ এখনো শয্যায় রোগের সাথে লড়ছেন। বাংলার গ্রামে একটি কথা আছে–”আগুন লাগার পর কুয়া খোঁড়া বৃথা।” প্রশ্ন উঠছে, এই সংক্রমণ বাড়ার আগে টিকাদান কর্মসূচি কতটা প্রস্তুত ছিল? ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি কোথায় ছিল? শিশুদের নিয়মিত টিকা কাভারেজ কি কমে গিয়েছিল? নাকি প্রশাসনিক কাগজে সাফল্যের রেখা টানা হলেও মাঠে ছিল ফাঁক?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, হাম শুধু একটি রোগ নয়; এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার আয়না। যেখানে টিকা দুর্বল, সচেতনতা কম, প্রাথমিক চিকিৎসা ভঙ্গুর –সেখানেই হাম দ্রুত মুখ তোলে। রোগটি তখন শুধু শরীরে নয়, ব্যবস্থাপনাতেও ছড়ায়। এখন জরুরি কাজ তিনটি–দ্রুত টিকাদান জোরদার করা, আক্রান্ত এলাকায় নিবিড় নজরদারি চালানো এবং হাসপাতালে শিশু চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো। সংখ্যার পেছনের মানুষগুলোকে ফিরিয়ে আনা যাবে না, কিন্তু পরের সংখ্যাটি থামানো যেতে পারে।
কারণ, রাষ্ট্রের সাফল্য প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে নয়, মায়ের কোলে বেঁচে থাকা শিশুর নিঃশ্বাসে মাপা হয়। আর যখন মৃত্যু দুইশ’ ছাড়ায়, তখন প্রশ্ন শুধু রোগ নিয়ে নয়–দায় নিয়েও প্রশ্ন ওঠে?