May 28, 2024, 7:23 pm

সংবাদ শিরোনাম
আদমদীঘির ধান শরিয়তপুরে উদ্ধার; গ্রেপ্তার-২ অবৈধভাবে চাঁদা উত্তোলনকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা হতে ০৬ জন পরিবহন চাঁদাবাজকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-১০ মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান এলাকা হতে গাঁজা ও বিদেশী পিস্তলসহ কুখ্যাত অস্ত্রধারী মাদক ব্যবসায়ী সাগর’কে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-১০ মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বৈদ্যুতিক খুঁটির সাথে ধাক্কায় চালকের মৃত্যু ঘূর্ণিঝড় রেমাল এর প্রভাবে উপকুলের সতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত কুড়িগ্রামে বেবী তরমুজের চাষে তিন মাসে আয় দেড় লাখ টাকা মাঝরাত্রে প্রবাসীর ঘরে ঢুকে স্ত্রীও মা কে ছুরি মেরে পালালো দুর্বৃত্তরা বগুড়ার শিবগঞ্জে জাতীয় অনলাইন প্রেসক্লাবের কমিটি গঠন: এমদাদুল আহবায়ক রবি সদস্য সচিব গাইবান্ধা প্রেসক্লাব’র কমিটি গঠিত প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ কামনা, বাগাতি পাড়ার ভূমিহীন রাবেয়া বেগমের

মানবেতর জীবনযাপন করছে বাগেরহাটের চিতলমারীর আদর্শ গ্রামের মানুষ

মানবেতর জীবনযাপন করছে বাগেরহাটের চিতলমারীর আদর্শ গ্রামের মানুষ

ডিটেকটিভ নিউজ ডেস্ক

বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার আদর্শ গ্রামের মানুষেরা মৌলিক অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে। শিশু, বৃদ্ধ প্রতিবন্ধিরা সেখানে ঝুঁকির মধ্যে অতঙ্কিতভাবে বেঁচে থাকছে বছরের পর বছর। উপজেলা সদর হয়ে প্রায় ৮ কিলোমিটার দুরে সরকারী আশ্রায়ন প্রকল্পের আশ্রিত নিরীহ পরিবারগুলো চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে। সরকারী কর্মকর্তারা পরিদর্শনে যান, গ্রামবাসীর দুঃখবেদনার কথা শোনেন, যাপিত জীবন দেখেন- কিন্তু কাজের কাজ হয়না কিছুই। সরকারী বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করেও তাদের দুঃখ ঘোচেনি। উপজেলার চরবানিয়ারী ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডে গ্রামটির অবস্থান। ‘গুচ্ছগ্রাম নামে পরিচিত। সরেজমিনে দেখা যায়, ভগ্নাবস্থায় পড়ে আছে সরকারী বসতঘরগুলি। বিগত ১৯ বছরে হয়নি কোন সংস্কার। জংধরা টিনের গুড়ি প্রতিনিয়ত খসে পড়ছে সেখানে। ঘর বসতের অনুপযোগী হওয়ায় ২০টি পরিবারের মধ্যে ৮টি পরিবার চলে গেছে অন্যত্র। বৃষ্টি কিংবা কুয়াশায় ভেজা থাকে ঘরের ছাউনি থেকে উঠোন। চারিদিকে গাছের ছায়ায় স্যাতসেঁতে পরিবেশ থাকলেও সরকারী গাছগুলোর ঢাল ঝুড়ে ফেলার অধিকার তাদের নেই। ছিন্নমুল ২০টি পরিবারের নিশ্চিত জীবনযাপনের জন্য দুই একর ৭৫ শতক জমিতে ১৯৯৮ সালের ৮ জুলাই সেনাবাহিনী এই গ্রামটি প্রতিষ্ঠা করে। প্রথম কয়েক বছর তাদের জীবন বেশ সুখের ছিল। বলেশ্বর ও মধুমতি নদীর মোহনার চরে প্রতিষ্ঠিত গ্রামটিতে চিতলমারী উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত হতে আসা নিরীহ সনাতন হিন্দু পরিবারগুলোর শান্তিতে কাটছিল দিন। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালী কতিপয় জোতদার তাদের জন্য নির্ধারিত জমির অধিকাংশ দখল করে নেয়। দখলদারদের জোরজবরদস্তির সামনে সেনাবাহিনী কর্তৃক এই গ্রামের জন্য নির্ধারিত জমির সীমানা পিলার হয়ে পড়ে ‘ঠুটো জগন্নাথ!’ অতঃপর ভূমির জন্য মামলা রজু হয় আদালতে। খাসভূমিতে আশ্রায়ন প্রকল্পের স্বল্পআয়ী আশ্রিতরা সেই মামলার খরচ জোটাতে হিমশিম খায়, তবুও চালায়- শেষ আশ্রয়স্থলটুকু হারাতে চায়না বলে। স্থানীয় সমাজ ওই বিত্তশালী দখলদারের বিরুদ্ধে রাশব্দটিও উচ্চারণ করতে সাহস পায়না। আদর্শ গ্রামের পক্ষে সরকার বনাম স্থানীয় দখলদারদের মামলা এখনো আদালতে চলমান। সরকার পক্ষের মামলার খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয় ওই গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলোর। আদর্শ গ্রামের সত্তরোর্ধ বয়সী সাধন চক্রবর্ত্তী ও কলেজ ছাত্র শুভঙ্কর মিস্ত্রি অভিযোগ করে বলেন, সেনাবাহিনী দুই একর ৭৫ শতক জমিতে আশ্রায়ন প্রকল্প করে। ২০টি পরিবারের বসতঘরসহ জায়গা বুঝিয়ে দিয়ে সেনাবাহিনী চলে যায়। এরপর স্থানীয় প্রভাবশালীরা তাদের জায়গা অর্ধেকেরও বেশি অংশ দখল করে নিয়েছে। দখলদাররা হলো খলিশাখালী গ্রামের গোবিন্দ ঘরামী, ভুপেনঘরামী, বাবুগঞ্জ বাজারের শান্তি বালা, মধু মন্ডল ও ব্রজেন মাঝি। জায়গার বিষয়ে আদালতে মামলা চলছে। কাঁদতে কাঁদতে তারা বলেন, আমরা দিনমজুর, দিনে আনি-দিনে খাই। কাজ না পালি খাবার জোটাতি কষ্ট হয়। তারপর বছরের পর বছর জমির মামলার ঘানি আমাগে টানতি হচ্ছে- কী যে জ¦ালায় আছি, কত কথা কবো আপনাগে? স্বামী সাধন চক্রবর্ত্তীকে ডাকতে ডাকতে দ্রুত বেগে হেটে আসেন দুলালী চক্রবর্ত্তী (৪৮)। চড়া সুরে তিনি বলেন, আপনাগো মতো লোকেরা বহুত আসে, লিখে নিয়ে যায়। মন্ত্রনালয়ের সাহায্য আসে আর উপজেলায় বইসে ভাগ করে খায়। তার পাশে দাঁড়িয়ে কলেজ ছাত্র অশোক বিশ্বাস বলেন, বছর খানেক আগে আশ্রায়ন প্রকল্প সংস্কারের টেন্ডার হয়। আমরা টেন্ডারের কাগজ দেখতি উপজেলায় যাই। ইউএনও অফিসের বিষ্ণুবাবু টেন্ডারের কথা স্বীকার করেন, তিনি কাগজের একটি কপি দেবেন বলে তল্লাশীর জন্য একশ টাকা রাখেন। দিনের পর দিন তার পেছনে ঘুরে টেন্ডারের কাগজের দেখা না পেয়ে আসা ছেড়ে দিয়েছি। আমাদের এই গ্রাম হতে উপজেলা পরিষদের দূরত্ব প্রায় ৮কিলোমিটার। প্রতিদিন বাইসাইকেল চালিয়ে যাতায়াতে যে কী কষ্ট হয়েছে! জুতা-স্যান্ডেলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সুমন্ত বিশ্বাস (৩৬) বলেন, বিদ্যুতের জন্য সরকারীভাবে ২১টি মিটার বরাদ্দ হয়েছে তিন বছর আগে। কিন্তু আমাদের বসতঘরগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা দেখে মিটারগুলো ফেরত গেছে। তিনি আরো বলেন, আশ্রায়ন প্রকল্পের সময় ১৯ বছর আগে নির্মিত লেট্রিনগুলো এখন ভেঙ্গেচুরে গড়ের মাঠ। তাই কাঁচা পায়খানা ব্যবহার করতে হয় সবাইকে। আর্সেনিকযুক্ত দুইটি লেট্রিন এখন অকোজো। খাবার পানি আনতে প্রতিদিন হেটে যেতে হয় এক কিলোমিটার দুরে পাশ্ববর্তী নাজিপুর উপজেলার চর-মাটিভাঙ্গায়। মৌলিক মানবাধিকার বিষয়ে কথা বলার সময় আদর্শ গ্রামের লোকেরা জানায়,। ঘর বসতের অনুপযোগী হওয়ায় ২০টি পরিবারের মধ্যে ৮টি পরিবার চলে গেছে অন্যত্র। বর্তমানে অবস্থানকৃত ১২টি পরিবারে মোট লোকসংখ্যা ৫৮ জন; তাদের মধ্যে শিশু ১৫ জন, প্রতিবন্ধী ৩ জন এবং এতিম ২জন। ১০টি পরিবার দিনমজুর, একটি পরিবার ক্ষুদ্র জুতা ব্যবসায়ী এবং একটি পরিবার পৌরহিত্য করে সংসার চালায়। তারা দিনে গড়ে দুইবেলা সাধারণ খাবার খায়। অধিকাংশ মানুষগুলো নানা রোগে আক্রান্ত, অর্থাভাবে সঠিক চিকিৎসা হয়না। এ গ্রামের স্কুল ও কলেজ পড়-য়া শিক্ষার্থীরা অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ থেকে হয় বঞ্চিত। একটি মাত্র সমবায় সমিতি এই পরিবারগুলোকে ঋণ দেয়, অন্য কোন এনজিও আদর্শগ্রামে কাজ করেনা। বছরে একবার দোল উৎসব ও মহানামযজ্ঞের অনুষ্ঠান হয়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। গলায় আঁচল জড়িয়ে জীর্ণ বসতঘরগুলির সামনের তুলসীতলায় ভক্তি-প্রণাম জানিয়ে কাঁদতে থাকেন পঞ্চাশোর্ধ বয়সী বৈষ্ণবী মালারানী বিশ্বাস। পেছন হতে তাঁর গলা জড়িয়ে ধরে হাসে চার বছর বয়সী নাতি শ্রীকান্তি। হয়তো এই ভালবাসার শক্তিতেই প্রতিদিন মৃত্যুর সাথে লড়াই করতে করতে আদর্শ গ্রামের মানুষেরা বেঁচে ওঠে, বেঁচে থাকে। গলাধরা কন্ঠে হাসিমুখে মালারানী বলেন, ‘১৯ বছর আইজ শান্তি পালাম, ১৫দিন পর আমাগে এহেনে আপনারা আসপেন, বাৎসরিক নামযজ্ঞ হবে। ১৬ প্রহরব্যাপী হবে গান। এলাকার মৎস্য ব্যবসায়ী মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, আদর্শ গ্রামের মানুষেরা একদম ভালো নেই। রাজনৈতিক নেতারা কেবল ভোটের সময় যান ওই গ্রামে। যথারীতি প্রতিশ্রুতির বানী শুনিয়ে আসেন- তারপর আর তাদের খবর পাওয়া যায়না। ইউএনও অফিসের সহকারী বিষ্ণুবাবু আদর্শ গ্রামের যুবকদের নিকট হতে কাগজ তল্লাশীর জন্য একশ টাকা গ্রহণের কথা অস্বীকার করেছেন। স্থানীয় ৬নং ওয়ার্ডের ইউপি মেম্বার পরিমল হীরা বলেন, আদর্শ গ্রামের অবস্থা ভীষণ খারাপ, বসবাসের অনুপযোগী। বর্তমান ইউএনও মোঃ আবু সাঈদ স্যারকে সাথে নিয়ে তিনবার ওই গ্রাম পরিদর্শন করিয়েছি। লিখিত আবেদনপত্রও দেয়া হয়েছে বিভিন্ন দপ্তরে। কিন্তু কাজের কাজ তো কিচ্ছু হয়না। চরবানিয়ারী ইউপি চেয়ারম্যান অশোক কুমার বড়াল বলেন, অনেক আগেই তাদের ১০টি ঘর পুড়ে গেছে। ওরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। এ বিষয়ে আমি উপজেলা আইন-শৃংঙ্খলা সভায় আলোচনা করেছি। জেলা প্রশাসককে বারংবার জানিয়েছি। কিন্তু কোণ সুফল আজো পাইনি। তোমরা পারলে একটু ওদের কথা লেখো। চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আবু সাঈদ বলেন, আদর্শ গ্রামের দুরবস্থার কথা লিখে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি গত জুন, ২০১৭ মাসে। কিন্তু এখনো তার উত্তর আসেনি, কিছুটা সময় তো লাগবে। চিতলমারী উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ¦ মুজিবর রহমান শামীম বলেন, আদর্শ গ্রামের দুরবস্থার কথা আমি জানি। সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মুকুল কৃষ্ণ মন্ডল (মুকুল তড়-য়া) আমাকে নিয়ে ওই গ্রাম পরিদর্শন করিয়েছেন। আসলেই তারা সমস্যায় আছে। বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান অশোক কুমার বড়াল তাদের জন্য কিছু করেছেন কি-না আমার জানা নেই। তবে সমস্যা সমাধানে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Share Button

     এ জাতীয় আরো খবর