সম্পাদকীয়
শরিফ ওসমান হাদি: এক নাম, এক অভ্যুত্থান, এক দায়,শরিফ ওসমান হাদি আর কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন—তিনি হয়ে উঠেছেন জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতীক, এক অনমনীয় প্রতিবাদের নাম। তার মৃত্যু শুধু একজন মানুষের প্রস্থান নয়; এটি রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং জাতির বিবেকের জন্য এক গভীর প্রশ্ন রেখে গেল।
শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। নজরুলের বিদ্রোহী চেতনার পাশে শায়িত হওয়া যেন ইতিহাসের এক নির্মম কিন্তু অর্থবহ সংযোগ—বিদ্রোহ থামে না, কেবল প্রজন্ম বদলায়।
জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত তার জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে—শরিফ ওসমান হাদি কোনো একক রাজনৈতিক বলয়ের নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন বঞ্চিত, ক্ষুব্ধ ও পরিবর্তনকামী মানুষের কণ্ঠস্বর। প্রধান উপদেষ্টা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা জানাজায় উপস্থিত থাকলেও প্রশ্ন থেকে যায়—জীবদ্দশায় কি রাষ্ট্র তাকে সেই গুরুত্ব ও নিরাপত্তা দিয়েছিল, যা একজন গণআন্দোলনের সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে তার প্রাপ্য ছিল?
জুলাই অভ্যুত্থান ছিল হঠাৎ কোনো বিস্ফোরণ নয়; এটি ছিল দীর্ঘদিনের বৈষম্য, দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক অনাস্থার জমে ওঠা ফল। সেই উত্তাল সময়ে শরিফ ওসমান হাদি সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, আপসের ভাষা নয়—প্রতিরোধের ভাষায় কথা বলেছিলেন। তার নেতৃত্বে ইনকিলাব মঞ্চ কেবল একটি প্ল্যাটফর্ম ছিল না, ছিল এক বিকল্প রাজনৈতিক কল্পনা—যেখানে ভয় নয়, ন্যায়বোধ মুখ্য।
আজ রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হচ্ছে, জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত। কিন্তু রাষ্ট্রীয় শোক তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা আত্মসমালোচনায় রূপ নেয়। এই মৃত্যু কি কেবল ‘দুঃখজনক ঘটনা’ হিসেবেই শেষ হবে, নাকি এর পেছনের সত্য, দায় ও ব্যর্থতাগুলো জাতি জানতে পারবে—সেটিই এখন মুখ্য প্রশ্ন।
আমরা বিশ্বাস করতে চাই, শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু কোনো পরিসংখ্যান হয়ে হারিয়ে যাবে না। তার জীবন ও সংগ্রাম যেন ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে প্রশ্ন করে—ক্ষমতা কাদের জন্য, রাষ্ট্র কার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, আর পরিবর্তনের মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যাদের কণ্ঠ স্তব্ধ করতে চাওয়া হয়, তারা শেষ পর্যন্ত স্মৃতিতে আরও উচ্চকণ্ঠ হয়ে ওঠে। শরিফ ওসমান হাদিও তেমনই এক নাম, যিনি মৃত্যুর পর আরও বেশি করে দায় চাপিয়ে গেলেন রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর।এই দায় এড়ানোর সুযোগ আর নেই।