যথাযথ সংস্কারের অভাব ও নির্মাণ ত্রুটিতে মেয়াদের আগেই ভাঙ্গছে জেলা সড়কগুলো
ডিটেকটিভ নিউজ ডেস্ক

প্রতিকী
নির্ধারিত মেয়াদের আগেই জেলা সড়কগুলোতে ভাঙন-ফাটল-গর্ত দেখা দিচ্ছে। মূলত যথাযথ সংস্কারের অভাব ও নির্মাণ ত্রুটির কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ দেশের মহাসড়ক নেটওয়ার্কের ৬২ শতাংশেরও বেশি জেলা সড়ক। কিন্তু ওসব জেলা সড়কের ৪৭ শতাংশই ভাঙাচোরা দশায় রয়েছে। সম্প্রতি সওজর আওতাধীন কেন্দ্রীয় সড়ক গবেষণাগার জেলা সড়কগুলো টেকসই না হওয়ার কারণ খুঁজে বের করতে অনুসন্ধান চালায়। তাতে দেখা যায়, নির্মাণল ত্রুটি ও সংস্কারের সময় প্রকৌশলগত বিষয়গুলো যথাযথ না মানায় নির্ধারিত মেয়াদের আগেই ওসব সড়ক নষ্ট হচ্ছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে সওজ’র অধীনে থাকা ৬টি সড়ক বিভাগের মোট ১৫টি জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা সড়কে সরেজমিন অনুসন্ধান চালিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে কেন্দ্রীয় সড়ক গবেষণাগার। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, যথাযথ নিয়ম না মেনে সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কারণেই জেলা সড়কগুলো টেকসই হচ্ছে না। সংস্কারের সময় যথাযথ নিয়ম না নামার পাশাপাশি নির্মাণ ত্রুটিকেও জেলা সড়কগুলো টেকসই না হওয়ার কারণ হিসেবে ওই প্রতিবেদনে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জেলা সড়কগুলো নির্মাণে ‘গুড ইঞ্জিনিয়ারিং প্র্যাকটিসেস’ অর্থাৎ বিভিন্ন প্রকৌশলগত কাজ যথাযথ নিয়ম মেনে করা হয় না। প্রকৌশলগত দুর্বলতার কারণে সড়কগুলোয় গর্ত-ফাটলের পাশাপাশি গঠনবিন্যাসেও (অ্যালাইনমেন্ট) ত্রুটি থেকে যাচ্ছে। সড়ক নির্মাণের আগে মাটিও পরীক্ষা করা হয় না। ফলে সড়কগুলো টেকসই হচ্ছে না, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও। সওজের আওতাধীন জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা সড়কগুলো নির্ধারিত সময়ের আগেই ফাটল বা গর্ত দেখা দেয়ার পেছনে এরকম ১১টি কারণ চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় সড়ক গবেষণাগার, যার মধ্যে সড়কে ব্যবহৃতত বিটুমিনের মানও একটি। তাছাড়া সড়ক টেকসই না হওয়ার আরো দুটি কারণের কথা বলছে সড়ক গবেষণাগার। সেগুলো হলো- অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই যান চলাচল ও সড়কগুলোয় পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকা।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশের আবহাওয়ায় সড়কের জন্য সবচেয়ে উপযোগী হলো ৬০/৭০ গ্রেডের বিটুমিন। সম্প্রতি সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারকাজে ওই মানের বিটুমিনের ব্যবহার শুরু হলেও ৮০/১০০ গ্রেডের বিটুমিনের ব্যবহার এখনো চলছে। ওই মানের বিটুমিন উচ্চ তাপমাত্রায় দ্রুত নরম হয়ে যায়। তাতে সড়কের কার্পেটিং টেকসই হয় না। পাশাপাশি সওজের যেসব পুরনো সড়ক রয়েছে, সেগুলো যথাযথ প্রক্রিয়ায় নির্মাণ না করার কারণে বিভিন্ন ত্রুটি থেকে গেছে। পরবর্তীতে সংস্কারের ক্ষেত্রেও সেগুলো পুরোপুরি ঠিক করা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া সওজের সড়কগুলো বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ঠিকাদারের মাধ্যমে নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে ওসব কাজের কারিগরি মান ঠিক থাকে না। ফলে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাছাড়া মাটির রাস্তা বা চলাচলের স্থানে জেলা সড়ক নির্মাণ করতে হলে কতগুলো প্রকৌশলগত দিক মেনে চলতে হয় এবং সড়ক নির্মাণের আগে সেটি উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হয়। কিন্তু বেশির ভাগ জেলা সড়কের ক্ষেত্রেই নির্মাণকাজে তড়িঘড়ি করতে গিয়ে প্রকৌশলগত দিকগুলো মানা হয়নি। ওই সমস্যাটি এলজিইডির সড়কগুলোয় বেশি। পাশাপাশি সওজের ফিডার রোডগুলোতেও সমস্যাটি প্রকট।
সূত্র আরো জানায়, জেলা সড়কগুলো ভাঙাচোরা হওয়ার অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে পানি জমে থাকা ও অতিরিক্ত মালবোঝাই গাড়ির চলাচল। সড়কে পানি জমে যাওয়ার ক্ষেত্রে মেইন্টেন্যান্স প্র্যাকটিস দায়ি। সড়কগুলোর ১০০ মিটারের মধ্যে প্রচুর অবকাঠামো বানানো হয়। যেগুলোর কারণে সড়কগুলোর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকাটাও ভাঙাচোরা সড়কের অন্যতম কারণ। কাজেই শুধু রাস্তা বানালেই গুড ইঞ্জিনিয়ারিং প্র্যাকটিস হয় না। ফাউন্ডেশনটাকে একেবারে নিচ থেকে তুলে নিয়ে আসাটাকেও গুড ইঞ্জিনিয়ারিং প্র্যাকটিস বলে না। গুড ইঞ্জিনিয়ারিং প্র্যাকটিস হলো, নির্মাণের সময় সড়ক ও ভূমির ব্যবহার বিবেচনায় রাখা। এ জিনিসটা প্রুথম থেকেই না থাকার কারণে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সড়কগুলো টেকসই হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে শুধু রাস্তা বানালেই হবে না, দীর্ঘস্থায়িত্ব পেতে হলে তার আশপাশের ভূমি ব্যবহারটাকে অবশ্যই সমন্বিত করতে হবে। রাস্তার পাশে পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা রাখার পাশাপাশি অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় সড়ক গবেষণাগারের পরিচালক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, দেশের জাতীয় মহাসড়কগুলো নির্মাণের ক্ষেত্রে ইঞ্জিনিয়ারিং প্র্যাকটিসে সমস্যা নেই। সমস্যা বেশি জেলা সড়কগুলোয়। ওসব সড়কের সমস্যা শুরু হয় নির্মাণের একেবারে শুরুর ধাপ থেকে। ফিডার রোডগুলোর সমস্যা আরো প্রকট। গ্রামাঞ্চলের অনেক রাস্তায় দেখা যায়, কখনো যাতায়াতের সুবিধার্থে মানুষের স্ব-উদ্যোগ এবং কখনো কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির মাধ্যমে রাস্তা নির্মাণ করা হয়। তাতে প্রকৌশলগত বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে ওসব রাস্তা যখন পাকা করা হয়, তখনো ঠিকাদাররা প্রকৌশলগত বিষয়গুলো ঠিকমতো মানেন না। সেটিই পরবর্তীতে সমস্যা হয়ে দেখা দিচ্ছে।