
লোকমান ফারুক, রংপুর
৪ এপ্রিল ২০২৬
শনিবার দুপুর। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করিডোরে সেই চিরচেনা ভিড়—হুইলচেয়ার, স্ট্রেচার, অপেক্ষমান স্বজন, আর দেয়ালে হেলান দিয়ে থাকা ক্লান্ত সময়। এই ভিড়ের ভেতর দিয়েই হাঁটলেন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোঃ হুজুর আলী। পাশে হাসপাতালের কর্মকর্তারা। সামনে কিছু দরজা খোলা, কিছু আধখোলা—যেন সেবার ভেতরেও এক ধরনের দ্বিধা। তিনি ওয়ার্ডে ঢোকেন, ইউনিট ঘুরে দেখেন। বিছানায় রোগী, বিছানার পাশে আত্মীয়, আর মাঝখানে চিকিৎসা ব্যবস্থার বাস্তবতা। কাগজে-কলমে যে সেবা—তার সঙ্গে চোখে দেখা সেবার ব্যবধান মাপা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়।
পরিদর্শন শেষে সংক্ষিপ্ত কথায় তিনি বলেন—স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। বাক্যটি পরিচিত। বহুবার শোনা। সরকারি বিবৃতির মতোই স্থির, নিরাবেগ। কিন্তু করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধার চোখে সেই বাক্যের অনুবাদ আলাদা —”ডাক্তার কখন আসবে?” অতিরিক্ত সচিব স্বীকার করেন, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। এই স্বীকারোক্তি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উন্নয়নের ভাষায় ‘চলমান’ শব্দটি প্রায়ই বাস্তবতার ওপর একটি নরম চাদর ফেলে দেয়। তিনি বলেন, উন্নয়ন কাজ দ্রুত শেষ করতে এ ধরনের পরিদর্শন চলবে।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পাশে ছিলেন। তাদের উপস্থিতি প্রশাসনিক কাঠামোর দৃঢ়তা দেখায়, কিন্তু রোগীর পাশে বসে থাকা স্বজনের কাছে কাঠামো নয়, দরকার ফলাফল। এই হাসপাতাল শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, রংপুর বিভাগের অসংখ্য মানুষের শেষ ভরসা। এখানে আসা মানে অনেক সময় শেষ চেষ্টা। সেই চেষ্টার ভেতর যদি দেরি থাকে, ঘাটতি থাকে, তাহলে উন্নয়ন শব্দটি কাগজে থাকে—জীবনে নয়। সরকারের বক্তব্য পরিষ্কার—সেবা পৌঁছাতে হবে মানুষের দোরগোড়ায়। কিন্তু প্রশ্নটা সেখানেই—দোরগোড়া কোথায়? শহরের হাসপাতালের গেট, না গ্রামের ঘরের উঠান?
আরও একটি প্রশ্ন থেকে যায়—পরিদর্শন কি কেবল দেখার জন্য, নাকি বদলের সূচনা করার জন্য?
শেষ পর্যন্ত হিসাবটা সহজ—ঘোষণা বনাম অভিজ্ঞতা।
কথা বনাম সেবা। এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোই আসল সাক্ষী। তাদের সাক্ষ্য কি কখনও নীতিনির্ধারণের টেবিলে পৌঁছায়?