ঝিনাইগাতীতে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে বৃদ্ধা মাকে হত্যার লোমহর্ষক কাহিনী
বুলবুল ইসলাম, জামালপুর ও শেরপুর প্রতিনিধি
শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে ফজিলা খাতুন (৮০) নামে এক বৃদ্ধা মাকে হত্যা করা হয়। গত ২৩মে রাতে উপজেলার হাতিবান্দা চকপাড়া গ্রামে এ ঘটনাটি ঘটে। বৃদ্ধা ওই গ্রামের মৃত আমজাদ হোসেনের স্ত্রী। এ ঘটনায় গত ১৭জুলাই মঙ্গলবার ওই বৃদ্ধার ছেলে মো. হাবিবুর রহমান ও তার স্ত্রী রেখা খাতুনকে গ্রেফতার করেছে ঝিনাইগাতী থানা পুলিশ। তাদের দুইজনের জবানবন্ধীর প্ররিপেক্ষিতে পরামর্শদাতা হাতিবান্দা ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মো. নাসিরকেও গ্রেফতার করা হয়। বৃদ্ধা ফজিলার লাশ উদ্ধারের পর থেকে পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে মামলাটি তদন্ত করে।আর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ঝিনাইগাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিপ্লব কুমার বিশ্বাসের নির্দেশে হত্যার রহস্য উদঘাটন করে আসামীও গ্রেফতার করা হয়।
এ হত্যা মামলার পুরো তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ‘ফজিলা খাতুন হত্যাকান্ড’ শিরোনামে ওসি বিপ্লব কুমার বিশ্বাস তার ব্যক্তিগত আইডিতে একটি পোস্ট দিয়েছেন। লেখাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে । ঝিনাইগাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিপ্লব কুমার বিশ্বাস তাতে লিখেছেন, আমার কাছে মনে হয় সবচেয়ে বেশী ঘটনা বহুল জীবন হচ্ছে একজন পুলিশ অফিসারের জীবন। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত আমাদের এমন সব গল্পের মুখোমুখি হতে হয় এবং সেই সব গল্পে এমন একটি গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করতে হয়, যেটা টিভিতে দেখলেই নাটক, আর পর্দায় দেখলেই সিনেমা। মাঝে মাঝে আমাদের সমাজে এমন কিছু অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয় এবং অসহনীয় ঘটনার জম্ম হয় যা সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। ঘটনার ভয়াবহতা এতটাই নির্মম এবং নৃশংস যে সেটা বিশ্বাস করা কঠিন। তেমনি একটি ঘটনা হচ্ছে হাতিবান্ধা ইউনিয়নের ফজিলা খাতুন হত্যাকান্ডের ঘটনা।
ঘটনার বর্ণনা-
গত ২৪ মে সকাল ৭টায় এস আই খোকন চন্দ্র সরকারের মোবাইলের ফোনের মাধ্যমে পবিত্র রমজান মাসের পবিত্রতা ভঙ্গ হয় একটি সংবাদে, স্যার হাতিবান্ধা গ্রামে একটি বয়স্ক মহিলার জবাই করা ডেডবডি পড়ে আছে। তখনও সকলের ঘুম ভাঙ্গেনি। আমরা চলে যাই হাতিবান্ধা গ্রামের ফজিলা খাতুনের বাড়ীতে।
ফজিলা খাতুন, অনুমান ৮৫ বছরের বৃদ্ধা। ছেলে হাবিবুর রহমান ভুট্টো ও তার স্ত্রী রেখা খাতুনের সাথে একই ঘরে বসবাস করতো। কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই ঢাকায় থেকে ভিক্ষা করতো। ভিক্ষা করে এনে সমস্ত টাকা পয়সা তার ছেলে ও ছেলের বউকে দিতো। প্রতিবেশীদের সাথে জমিজমা নিয়ে তার ছেলে ভুট্টোর বিরোধ ছিল। কিন্তু কোন ভাবেই পেরে উঠছিলনা। হত্যার দেড় মাস আগে চক্রান্ত ও পরিকল্পনা করে নিজের মা কে মেরে ফেলার। মাকে হত্যা করে তার প্রতিবেশীদের ঘায়েল করবে এটাই ছিল তার উদ্দেশ্য। মাকে হত্যা করার পরিকল্পনা তার স্ত্রীকেও জানায়। তিনানী বাজারের স্থানীয় এক কামারের দোকান থেকে ১৫০০ টাকায় একটি রামদাও কিনে এনে ঘরের বিছানার নিচে রাখে। ঘটনার দিন সকাল বেলা প্রতিবারের মত বৃদ্ধা ফজিলা খাতুন ঢাকায় ভিক্ষা করার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়। পাকা রাস্তার কাছ থেকে তার ছেলে হাবিবুর রহমান ভুট্টো তার মাকে বাড়ীতে ফেরত নিয়ে আসে বলে আজ ঢাকায় যেতে হবেনা। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আগেই বসত ঘরের টিনের বেড়ার একটি টিন খুলে রেখে এমন ভাবে চেপে রাখা হয় যেন তার মা বুঝতে না পারে। বিকাল বেলা হাবিবুর রহমান বাড়ী থেকে বেড়িয়ে যায়। সুইচ গেইটে ইফতার করে। পরে রাত্রী ১২.০০ টার সময় গোপনে বাড়ী এসে টিনের বেড়ার ফাক দিয়ে ঘরে ঢোকে মুখে গামছা পেচিয়ে তার মা ফজিলা খাতুনকে ঘরের বাইরে নিয়ে যায়। তার স্ত্রী দরজা খুলে দেয়। ধারালো রামদা দিয়ে নিজ হাতে তার মাকে জবাই করে মৃত দেহ কলাগাছের ঝোপের মাঝে ফেলে চলে যায়। যাওয়ার সময় তার স্ত্রীকে বলে যায় দরজা লাগিয়ে ফেলতে এবং এক ঘন্টা পর ডাক চিৎকার করতে। যেন সবাই বুঝতে পারে হাবিবুরের স্ত্রী ঘুমিয়ে ছিল, বাহির থেকে টিনের বেড়া কেটে কেউ এসে ঘরে ঢোকে তার মাকে খুন করে গেছে। তার স্ত্রীও স্বামীর কথা মতই কাজ করে। রাত অনুমান ০৩.০০ টার সময় সুইচ গেইটের নিকট মায়ের মৃত্যুর সংবাদ শুনে হাবিবুর রহমান সকলের সামনে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অভিনয় করে। সকালবেলা পুলিশের সাথে সে তার মায়ের মৃত দেহ দেখতে যায়। ৮৫ বছরের এমন জুবু থুবু বৃদ্ধাকে কে হত্যা করবে? এই বৃদ্ধাকে হত্যা করলে কার স্বার্থ হাসিল হয়? এই বিষয়টি প্রাথমিক তদন্তে আমাদের কাছে বিরাট এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাড়ায়।থানায় খুনের মামলা হয়। ডেডবডি পোষ্টমর্টেমে পাঠানো হয়। শুরু হয় তদন্ত। কিন্তু কোন ক্লুই পাওয়া যাচ্ছিলনা। ফজিলা খাতুনের ছেলে হাবিবুর রহমান ভুট্টোকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সে জানায় সে বাড়ী ছিলনা। মধ্য রাত্রীতে মোবাইল ফোনে তার স্ত্রী তাকে তার মায়ের হত্যাকান্ডের ঘটনা জানায়। হাবিবুরের স্ত্রী রেখা খাতুনও তার স্বামীর সাথে সুর মিলিয়ে কথা বলে। কিন্তু শুরু থেকেই তাদের কথা বার্তা এবং আচরন ছিল সন্দেহজনক।অবশেষে তদন্তে বেড়িয়ে আসতে থাকে হত্যাকান্ডে তাদের সংশ্লিষ্টতা। পরিশেষে হাবিবুর রহমান ও তার স্ত্রীকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে বেড়িয়ে আসে নির্মম নৃশংস হত্যাকান্ডের মূল রহস্য। যেটা শুনার জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না। বেরিয়ে আসে স্থানীয় কিছু কুচক্রী লোকের কুপরামর্শের বিষয়। জমি জমা সংক্রান্ত বিরোধ কে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য নিজের জন্মদাত্রী মাকে কেউ নৃশংস ভাবে জবাই করে হত্যা করতে পারে এটা সকলের কাছে ছিল কল্পনাতীত । হাবিবুর রহমান @ ভুট্টোর জবানবন্দির প্রেক্ষিতে তার বসত বাড়ী থেকে উদ্ধার করা হয় হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত গামছা এবং বাড়ীর সামান্য দুরের ডোবা থেকে তার দেখানো মতে উদ্ধার করা হয় হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত ধারালো রামদা ।ঘটনাটি শুনে আমাদের পুলিশ সুপার মহোদয় এবং এ এস পি নালিতাবাড়ী সার্কেল মহোদয় তাৎক্ষনিক ভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেন এবং ঘটনাটি নিবিড় পর্যবেক্ষনে রাখেন। অবশেষে তারা কোর্টে দোষ স্বীকার করে, স্থান হয় জেল হাজতে।ঝিনাইগাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিপ্লব কুমার বিপ্লব কুমার বিশ্বাস তাতে আরও লিখেছেন, আমরা চাইনা মানুষ এমন অমানুষ হয়ে যাক। আমরা জানি মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত। তাই আজ থেকে আমরা যে যেখানেই থাকি আমাদের মায়ের প্রতি খেয়াল রাখি তাঁদের যত্ন নেই।