গোপালগঞ্জে ৩ বছর ধরে মাদ্রাসা ছাত্র নিঁখোজ
ডিটেকটিভ নিউজ ডেস্ক

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলায় ৩ বছর ধরে নিঁখোজ রয়েছে মাদ্রাসা ছাত্র ইবাদাত মোল্লা (২০)। নিঁখোজের ৩ বছর পর ইবাদাতের পরিবারের পক্ষ থেকে খুনের অভিযোগ করছে। ইবাদাতের মা ফুলজান বেগম (৪৫) জানান, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষ পরিকল্পিত ভাবে আমার ছেলেকে জবাই করে হত্যা করেছে।
জানাগেছে, উপজেলার আমতলী ইউনিয়নের উনশিয়া গ্রামের মৃত জয়নাল মোল্লার ছেলে বিগত ২০১৪ সালের ১৫ অক্টেবর সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বের হয়ে মাদ্রসার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে নিখোঁজ হন। সে গোপালগঞ্জ শহরের মুসলিম এতিমখানা ও ইসলামি মিশন মাদ্রসার হেফজ বিভাগের ছাত্র ছিলো। জমি নিয়ে বিরোধে জেরে ২০১৩ সালে প্রতিপক্ষ কাদের শেখ মাদ্রসা ছাত্রের পিতা জয়নাল মোল্লাকে হত্যা করে। মাদ্রসা ছাত্রের পরিবার অসহায় ও দরিদ্র। তাদের নিশ্চিহ্ন করতেই গ্রামের প্রতিপক্ষের সাথে একটি প্রভাবশালী মহল যুক্ত হয়েছে। হত্যাকারীদের দু’ হত্যা মামলা থেকে রক্ষায় প্রভাবশালী মহলটি অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
গোপালগঞ্জ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) আদালতের নিদের্শে ইবাদত নিখোঁজ মামলার তদন্তে নেমে ৬ নং আসামি বক্কার তাজকে গ্রেফতার করে। বক্কার তাজ ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি প্রদাণ করে নিজেকে এ হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। তিনি আদালতকে বলেন, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে আমতলী ইউনিয়নের দক্ষিনপাড় গ্রামের কাদের শেখ সহ ৭ জন মিলে ইবাদতকে জবাই করে হত্যা করে। পরে এ মামলার অপর আসামি নাসির তাজকে গ্রেফতার করে পিবিআই। আদালতে নাসির তাজও একই স্বীকারোক্তি মুলক জবানবন্দি দিয়েছে।
এ ব্যাপারে মাদ্রাসা ছাত্র ইবাদতের মা ফুলজান বেগম ২০১৪ সালে গোপালগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে নালিশী পিটিশন দায়ের করেন। আদালত পিটিশনটি এফআইআর করার জন্য কোটালীপাড়া থানাকে নির্দেশ দেয়। পুলিশ মামলাটি এফআইর করে। কোটালীপাড়া থানার এসআই মনজের আলী এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নিযুক্ত হয়। ২০১৭ সালের ২ মার্চ পর্যন্ত তিনি মামলাটি তদন্ত করেন। মনজের আলীর বদলী জনিত কারণে ৩ মার্চ থেকে এ মামলায় নতুন তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে কাজ শুরু করে কোটালীপাড়া থানার ওসি (তদন্ত) মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি চলতি বছরের গত ১৩ এপ্রিল এ মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন।
চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তিনি মাদ্রাসা ছাত্র ইবাদত মোল্লা নিখোঁজের বিষয়টি সত্য উল্লেখ করেন। ওই মাদ্রাসা ছাত্র ২০১৪ সালে হেফাজতের আন্দোলনে অংশ নিয়ে দুর্ঘটনায় কবলিত হয়ে অনাকাংখিত ঘটনার সম্মূখিন হতে পারে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন। এ রিপোর্টে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ওসি (তদন্ত) মোস্তাফিজুর রহমান মামলার আসামীদের স্বাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
আসামীদের রক্ষায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আদলতে মনগড়া ছ’ড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে। এমন অভিযোগ এনে আদালতে মামলার বাদী ফুলজান বেগম নারাজি পিটিশন করেন। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য গোপালগঞ্জ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেষ্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দেয়।
মামলার বাদী ফুলজান বেগম বলেন, আমার স্বামীর দক্ষিণপাড়া গ্রামের ৭ কাঠা জমি জোর করে দখল নিতে চায় কাদের শেখ। ২০১৩ সালের ২৯ জানুয়ারী আমাদের জমিতে ট্রাকটর দিয়ে কাদের শেখ চাষ দেয়। আমার স্বামী প্রতিবাদ করলে তাকে সহ আমাদের পরিবারের সদস্যদের পিটিয়ে আহত করে কাদের ও তার লোকজন। তারপর হাসপতালে আমার স্বামীকে ভর্তি করি। সেখানে দীর্ঘ দিন চিকিৎসার পর আমার স্বামী মারা যায়। এ-সংক্রান্ত মামলা প্রতিপক্ষ থানা পুলিশকে টাকা দিয়ে ধামা চাপা দিয়েছে। এ ব্যাপারে গ্রাম্য সালিশের ব্যবস্থা করা হয়। আমরা সালিশ মেনে না নেয়ায় প্রভাবশালীরা প্রতিপক্ষের পক্ষ নিয়ে আমাদের একের পর এক মামলা দিয়ে হয়রানি করছে। পরে ২০১৪ সালে আমার ছেলে ইবাদতকে ধরে নিয়ে হত্যা করেছে। এ মামলা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতেও টাকা দিয়ে তারা অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। মামলা চালাতে আমি ৩ বিঘা ফসলী জমি। বাড়ির ১০ কাঠা ভিটা ,মূল্যবান গাছ-পালা, গরু ছাগল বিক্রি করেছি। এখন আমি নিঃস্ব। তারপরও আমি আমার স্বামী ও সন্তান হত্যার বিচার চাই।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গোপালগঞ্জ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেষ্টিগেশনের এস.আই আরিফুর রহমান ফারাজি জানান, গত ১৪ অক্টোবর ঢাকার আশুলিয়া থেকে মামলার আসামি বক্কার তাজকে গ্রেফতার করা হয়। সে ১৬৪ ধারায় আদালতে জাবনবন্দী দিয়েছে। সেখানে সে বলেছে, ২০১৪ সালের ১৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় গ্রামের বাড়ি থেকে ইবাদত মাদ্রসার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। সে গোপালগঞ্জ-কোটালীপাড়া সড়কে আসলে কাদের শেখ, কাবুল শেখ, লালন শেখ, রিপন শেখ মাদ্রসা ছাত্রকে থ্রিহুইলারে (মাহেন্দ্র ) তোলে। রাতে তাকে কাদের শেখের দক্ষিণপাড় গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসে। পরে সে সহ অন্যন্যদের কাদের মোবাইলে ঘটনাস্থলে ডেকে নেয়। কাদেরের ঘরের পেছনে নিয়ে মাদ্রসাছাত্রকে মুখ চেপে মারপিট করা হয়। পরে ওই মাদ্রসা ছাত্রের ডান পা ধরে কাদের। বাম পা ধরে কাদেরের ছেলে রিপন। সাবেক মেম্বর আউয়াল কোমড় চেপে ধরে। নাসির মেম্বর বুকের উপর চেপে ধরে। ডান হাত ধরে কাদেরের ছেলে লালন। বাম হাত ধরে নাসির তাজ। মাথা ও ঘার চেপে ধরে বক্কার তাজ। দা দিয়ে জবাই করে নাসিরের ভাই কাবুল শেখ। পরে কাদের শেখ সহ ২/৩ জন নৌকায় করে বিলের মধ্যে মাদ্রাসা ছাত্রের লাশ নিয়ে পুতে রাখে। বিলে লাশ গুম করার সময় বক্কার তাজ ছিলেননা বলে জানান। নাসির তাজও আদালতে একই বক্তব্য পেশ করেছে বলে জানান ওই পুলিশ কর্মকর্তা।
অভিযুক্ত কাদের শেখের স্ত্রী এরিনা বেগম বলেন, জমিজমা নিয়ে ফুলজান বেগমের সাথে আমাদের বিরোধ আছে। আমাদের জমি লিখে দেয়ার কথা বলে লিখে দিয়নি। উল্টো আমাদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা দিয়ে হয়রানী করছে। এখন ছেলেকে লুকিয়ে রেখে আমাদের বিরুদ্ধে গুম কেস দিয়েছে। তার ছেলে মাদ্রসা থেকে হেফাজতের আন্দোলনে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছে বলে পুলিশ প্রতিবেদন দিয়েছে। আমাদের এখানে কোন খুনের ঘটনা ঘটেনি। গ্রেফতারকৃত বক্কার তাজ ও নাসির তাজ পুলিশের মারপিটের ভয়ে আদালতে মিথ্যা স্বীকারোক্তি দিয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
কোটালীপাড়া থানার ওসি (তদন্ত) মোস্তাফিজুর রহমান মাদ্রসা ছাত্র ইবাদত নিখোঁজ মামলায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল নিয়ে এ প্রতিবেদকের সাথে কোন কথা বলতে রাজি হননি।
গোপালগঞ্জ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেষ্টিগেশনের ওসি শংকর চন্দ্র মাতব্বর বলেন, ৩ মাসের মধ্যে আমরা এ ঘটনার রহস্য উম্মেচন করেছি। হত্যাকান্ডের কথা স্বীকার করে দু’ আসামি আদালতে স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এখন এ ঘটনার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। আমরা মাদ্রসা ছাত্রের মরদেহ উদ্ধারে তৎপরতা চালাচ্ছি। মরদেহ উদ্ধার করতে পারলেই মামলা আরো গতি পাবে।