আয় থেকে ব্যয় বেশি হওয়ায় আর্থিক সংকটে নতুন বীমা কোম্পানিগুলো
ডিটেকটিভ নিউজ ডেস্ক

নতুন বীমা কোম্পানিগুলোর আয় থেকে ব্যয় বেশি হচ্ছে। ফলে ইতিমধ্যে ওসব কোম্পানির হিসাব নেতিবাচক হয়ে পড়েছে। ফলে ভয়াবহ আর্থিক সঙ্কটে পড়েছে ওসব প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি মালিকদের অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা তো আছেই। ইতিমধ্যে কয়েকটি কোম্পানি তো নামেমাত্র টিকে আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবতা আমলে না নিয়ে শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় কোম্পানি অনুমোদন দেয়ার কারণে বীমা খাত বিশৃঙ্খল হয়েছে।
তাদের মতে, বাংলাদেশের তুলনায় ভারতে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ৫০ গুণ বেশি। কিন্তু দেশটিতে বীমা কোম্পানির সংখ্যা মাত্র ১৫টি। বিপরীতে বাংলাদেশে ৭৮টি কোম্পানি কাজ করছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় বীমা কোম্পানির সংখ্যা বেশি। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মধ্যে তীব্র অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতেছে ।
আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে মিথ্যা প্রলোভনে গ্রাহক বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে। সামগ্রিকভাবে যা বীমা খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
শেষ পর্যন্ত ওসব কোম্পানি টিকে থাকবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। আর জনবলের অভাবে ওসব কোম্পানির ওপর নজরদারি করতে পারছে না নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি (আইডিআরএ)।
বীমা খাতে যে হারে অনিয়ম হচ্ছে, সে তুলনায় কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। যা বীমা কোম্পানিগুলোকে আরো বেপরোয়া করে তুলছে। তারপরও আগামী নির্বাচন সামনে রেখে আরও নতুন বীমা কোম্পানির জন্য তদবির করছেন কেউ কেউ।
সূত্র জানায়, বাজারের চাহিদা এবং সব পক্ষের সুপারিশ ও পরামর্শ উপেক্ষা করে শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় ২০১৩-১৪ সালে ১৬টি বীমা কোম্পানির অনুমোদন দেয় সরকার। বতর্মানে এর সবগুলোই সংকটে। তার মধ্যে বেশি সংকটে ৭টি নতুন কোম্পানি।
কোম্পানিগুলো পরিচালন ব্যয় মেটাতে গ্রাহকের সঞ্চয়ের টাকার বড় একটি অংশ খরচ করে ফেলেছে। ফলে ঝুঁকিতে রয়েছেন ওসব কোম্পানির গ্রাহক। আর্থিক সংকটে ওসব কোম্পানি কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছে না।
নতুন কোম্পানিগুলোকে আর্থিকভাবে লাভজনক হতে বছরে অন্তত ১০ কোটি টাকার প্রিমিয়াম আয় করতে হয়। কিন্তু ওসব কোম্পানি গড়ে ৩ থেকে ৫ কোটি টাকা আয় করছে এবং আয়ের তুলনায় তাদের ব্যয় হচ্ছে বেশি। ওই কারণে ঝুঁকি বেড়েছে। সর্বশেষ বেসরকারি বীমা কোম্পানির লাইসেন্স দেয়া হয় ২০১৩ সালে। তখন সাধারণ ও জীবন বীমার ১৩ কোম্পানি অনুমোদন দেয়া হয়। তার মধ্যে বেশিরভাগই জীবন বীমা।
ওসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের উদ্যোক্তা ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী, এমপি ও তাদের ঘনিষ্ঠজন। অনুমোদন পাওয়া কোম্পানিগুলোকে ৩ বছরের মধ্যে শেয়ারবাজারে আসার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। ২০১৩ সালের জুলাইয়ে ১৬টি বীমা কোম্পানি অনুমোদন পায়। ২০১৫ সালের জুলাইয়ের মধ্যে সেগুলোর শেয়ারবাজারে আসার সময়সীমা শেষ হয়েছে। কিন্তু কোনো কোম্পানিই এখন পর্যন্ত আসতে পারেনি। কারণ শেয়ারবাজারে আসতে হলে প্রতিষ্ঠানকে পরপর ৩ বছর লাভজনক হতে হয়। কিন্তু মুনাফায় আসা দূরের কথা, গ্রাহকের সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে কোম্পানিগুলো।
সূত্র আরো জানায়, দেশের ৭৮টি বীমা কোম্পানির মধ্যে জীবন বীমা ৩০টি ও সাধারণ বীমা ৪৮টি। দুই খাত মিলিয়ে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৪৬টি। বর্তমানে বীমা খাতে সম্পদের পরিমাণ ৩৫ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। তার মধ্যে জীবন বীমায় ২৯ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা ও সাধারণ বীমায় ৫ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। তবে প্রতারণার কারণে বিশাল ওই খাতের প্রতি মানুষের আস্থা নেই। ২০১০ সালে নতুন বীমা আইন হওয়ার পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও ব্যাপক অনিয়ম রয়েছে।
এদিকে নতুন বীমা কোম্পানিগুলোর নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি শেখ কবির হোসেন জানান, কিছু কোম্পানির অবস্থা খারাপ। কারণ এটি প্রতিযোগিতার বাজার। তাছাড়া এ খাতে দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। তবে কোম্পানিগুলো তাদের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠছে। আইডিআরএ তাদের সহায়তা করছে। বীমা খাতে এক সময় আস্থার সংকট ছিল। বর্তমানে তা কেটে যাচ্ছে। কারণ বেশ কিছু কোম্পানি বড় বড় দাবি পূরণ করেছে। এটি ইতিবাচক দিক।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সদস্য গকুল চাঁদ দাস জানান, নতুন বীমা কোম্পানির অবস্থা খারাপ। কারণ এটি প্রতিযোগিতার বাজার। এখানে সক্ষমতা দিয়ে টিকে থাকতে হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে ওসব কোম্পানিকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা করা হচ্ছে। তাছাড়া বীমা খাতে দীর্ঘদিন এক ধরনের আস্থার সংকটতো রয়েছেই। তার কারণ হল এ খাতের ইতিবাচক দিকগুলো প্রচার হয় না। কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম নজরদারির জন্য আইডিআরএ সাধ্যমতো চেষ্টা করছে। কিন্তু আমাদের জনবল সীমিত। বর্তমানে আইডিআএর কার্যালয়ে মাত্র ৩৪ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। আর ৪৬টি সাধারণ বীমা কোম্পানির জন্য মাত্র ১ জন কর্মকর্তা কাজ করছেন। তবে জনবল বাড়ানোর চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।