বরিশালে খ্রীষ্ট্রানপল্লীর শতাধিক পরিবার দিন কাটাচ্ছে আতঙ্কে
ডিটেকটিভ নিউজ ডেস্ক

জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরধরে সন্ত্রাসী হামলা, নারীর শ্লীলতাহানি ও প্রাণনাশের অব্যাহত হুমকির মুখে জেলার গৌরনদী উপজেলার নলচিড়া ইউনিয়নের পিঙ্গলাকাঠী খ্রীষ্ট্রানপল্লীর শতাধিক পরিবারের সদস্যরা ফের সন্ত্রাসী হামলার ভয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। সম্ভ্রম হারানোর ভয়ে অধিকাংশ পরিবারের নারী ও যুবতীরা অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। এ ঘটনার প্রতিকার চেয়ে গৌরনদী মডেল থানায় আবেদন করেছেন পল্লীর বাসিন্দারা।
সরেজমিনে জানা গেছে, পিঙ্গলাকাঠী গ্রামের জেএল ১৫৬নং পিঙ্গলাকাঠী মৌজার এসএ ৭০২নং খতিয়ানের ৩০৬১ নং দাগের দুই একর ৬৯ শতক জমির একটি দিঘী নিয়ে খ্রীষ্ট্রানপল্লীর বাসিন্দা রবার্ট হালদার, প্রদীপ হালদার, সমীর হালদার, নিত্যানন্দ হালদার, নির্মল হালদার গংদের সাথে একই গ্রামের প্রভাবশালী মৃত করম আলীর পুত্র নুর উদ্দিনের দীর্ঘদিন থেকে বিরোধ চলে আসছে।
রবার্ট হালদার ও সমীর হালদার জানান, তাদের পূর্ব পুরুষ গত ৮০ বছরেরও অধিক সময় ধরে ওই সম্পত্তি ভোগ দখল করে আসছেন। বর্তমানেও তারা ভোগ দখলে রয়েছেন। চলতি ভূমি জরিপেও ওই জমি তাদের নামে রেকর্ডভূক্ত হয়েছে। সম্প্রতি সময়ে স্থানীয় প্রভাবশালী আবুল হোসেন ও নুর উদ্দিনসহ কতিপয় ব্যক্তিরা ওই সম্পত্তি জবর দখল নিতে জালজালিয়াতির মাধ্যমে কাগজপত্র তৈরী করে পুরো সম্পত্তি দখলের পায়তারা শুরু করেন।
আবুল হোসেন জমির জাল ডিগ্রী তৈরী করে দখল নেয়ার চেষ্টা করলে খ্রীষ্ট্রানপল্লীর বাসিন্দা যোগেস হালদার বাদী হয়ে ১৯৮২ সালে ডিগ্রী রোধে বরিশালের গৌরনদী সহকারী জজ আদালতে একটি মামলা দায়ের করার পর কাগজপত্র পর্যালোচনা করে আদালতের বিচারক বাদী যোগেস হালদারের পক্ষে রায় প্রদান করেন। পরবর্তীতে ওই চক্রের আরেক সদস্য প্রভাবশালী মৃত করম আলীর পুত্র নুরু উদ্দিন জালকাগজপত্র বলে বিভিন্ন সময় জমির মালিকানা দাবি করে দখলের পায়তারা করে আসছেন।
রবার্ট হালদার অভিযোগ করেন, গত ২০ জানুয়ারি নুরুউদ্দিনের ভাতিজা মাইনুদ্দিন ও নুর জামালের নেতৃত্বে তাদের ১৫/২০ জন সহযোগীরা দিঘীর মালিকানা দাবি করে সাইনবোর্ড ঝোলাত আসে। এ সময় তাদের বাঁধা দিলে সন্ত্রাসীরা পল্লীর বাসিন্দাদের ওপর হামলা চালিয়ে তিনজনকে আহত করে। একপর্যায়ে গ্রামবাসীর বাঁধার মুখে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। এরপর থেকেই সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন ধরনের হুমকি অব্যাহত রেখেছেন।
অভিযোগে আরও জানা গেছে, গত ২২ জানুয়ারি রাতে পল্লীর বাসিন্দা রোমিও হালদারের স্ত্রী সাথী হালদারকে (২৪) জোরপূর্বক তুলে নিয়ে পাশবিক নির্যাতনের চেষ্ঠা চালায় সন্ত্রাসীরা। এ সময় গৃহবধূ সাথীর চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে আসলে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। ঘটনার পর থেকে পুরো খ্রীষ্ট্রান পল্লীর নারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পরে।
সাথী হালদার অভিযোগ করে বলেন, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধে আমার স্বামী অগ্রনী ভূমিকা রাখার কারণে সন্ত্রাসীরা আমাকে ধরে নিয়ে নির্যাতনের চেষ্টা চালিয়েছিলো। পল্লীর বাসিন্দা কাজল হালদার ও রিনা হালদার বলেন, সন্ত্রাসীরা প্রতিনিয়ত আমাদেরকে ইজ্জতহানীর হুমকি অব্যাহত রেখেছে। যে কারণে আমাদের কিশোরী ও যুবতী মেয়েরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। আমরা পরিবার পরিজন নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভূগছি। ইতোমধ্যে সম্ভ্রম হারানোর ভয়ে অধিকাংশ পরিবারের যুবতী ও কিশোরীদের নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।
সূত্রমতে, সাথী হালদারকে তুলে নিয়ে পাশবিক নির্যাতনের চেষ্টায় ঘটনায় ওইদিনই থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। গৌরনদী মডেল থানার এসআই শারমিন সুলতানা বলেন, লিখিত অভিযোগটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
খ্রীষ্ট্রানপল্লীতে গিয়ে দেখা গেছে, দিঘীর চারপাশে খ্রীষ্ট্রসম্প্রদায়ের প্রায় শতাধিক পরিবারের বসবাস। গত কয়েকদিন থেকে সন্ত্রাসীদের হামলার আশংকায় পুরো পল্লীতে রাত জেগে পাহারা বসিয়েছেন পল্লীর বাসিন্দারা। দিয়ে থাকি। স্থানীয় গ্রামপুলিশ হাবিবুর রহমান বলেন, খ্রীষ্ট্রানপল্লীর আতঙ্ক কাটাতে আমি নিজেও পল্লীর বাসিন্দাদের সাথে পাহারায় অংশগ্রহণ করে আসছি।
অভিযোগ অস্বীকার ও জমির বৈধ মালিকানা দাবি করে মোঃ নুরুউদ্দিন বলেন, আমার দাদা জঙ্গু সরদার প্রায় শত বছর পূর্বে লক্ষ্মিচরন সেনের কাছ থেকে দলিলমূলে সম্পত্তি ক্রয় করেছেন। দলিল মোতাবেক সম্পত্তির মালিক আমি। তার ভাতিজা মহিউদ্দিন এবং নুর জামাল হামলা ও হুমকির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, খ্রীষ্ট্রানপল্লীর বাসিন্দারা প্রশাসনের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা নিতে ষরষন্ত্র ও মিথ্যাচার চালাচ্ছে।
এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম হাফিজ মৃধা বলেন, জমির মালিকানার বিরোধ আদালতে নিস্পত্তি হবে, খ্রীষ্ট্রানপল্লীতে যদি কেউ আতঙ্ক সৃষ্টি করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। গৌরনদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি মোঃ আফজাল হোসেন বলেন, খ্রীষ্ট্রানপল্লীতে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরধরে দখলের চেষ্টা ও নারীর শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটেছে যা তদন্ত চলছে। আতঙ্কের বিষয়ে আমার জানা নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।