সরকারের গৃহায়ন তহবিল থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপি বিপুলসংখ্যক এনজিও
ডিটেকটিভ নিউজ ডেস্ক

সরকারের গৃহায়ন তহবিল থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করতে পারছে না বিপুলসংখ্যক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও)। দেশের ৪৫টি জেলায় ১৭৬টি এনজিও ইতিমধ্যে ঋণখেলাপি হয়ে পড়েছে। বছরের পর বছর ওসব প্রতিষ্ঠান ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেনি। এরই মধ্যে উধাও হয়ে গেছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। ওসব প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িতদের খুঁজে পাচ্ছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। খেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রাজধানী ঢাকাতেই আছে ৩৭টি প্রতিষ্ঠান। বাকিগুলো বিভিন্ন জেলায়। ইতিমধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এনজিওবিষয়ক ব্যুরো সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর বসতঘর বানানোর জন্য এনজিওগুলো ঋণ বিতরণ করে। বাংলাদেশ ব্যাংক দুস্থদের মাঝে বিতরণের জন্য ঋণ হিসেবে বেসরকারি সেবা সংস্থাগুলোকে ওই টাকা দেয়। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান ঋণ নিলেও তা পরিশোধ না করায় তারা খেলাপি হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন পর্যায় থেকে অনুমোদন দেয়ায় এনজিওগুলোর ওপর কারোর একক কর্তৃত্ব নেই। তারা কোথায় কী করছে তা যথাযথভাবে মনিটর করা হচ্ছে না। এ সুযোগে অনেকেই অনুমোদন ছাড়াও নানা ধরনের কার্যক্রম চালাচ্ছে, যা এ খাতের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। ঋণখেলাপি হয়ে পড়া ১৭৬টি এনজিওর মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা। তার মধ্যে ঢাকাতে ৩৭টি প্রতিষ্ঠান খেলাপি হয়ে পড়েছে। ওসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। খেলাপি সংস্থাগুলোর মধ্যে ৮ বছরেও কিস্তি পরিশোধ করেনি ঝালকাঠির হিলফুল ফুযুল সমাজ কল্যাণ সংস্থা। বর্তমানে সংস্থাটির কাছে ব্যাংকের পাওনা ১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এছাড়া ১১ বছরেও কোনো কিস্তি পরিশোধ করেনি ঝিনাইদহের গণজাগরণ সমাজ কল্যাণ সংস্থা। ৬ বছরেও কিস্তি পরিশোধ করেনি ঢাকার ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন। আর ৮ বছরেও কিস্তি পরিশোধ করেনি সাভারের রিসার্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন ফর দ্য পিপল। সাড়ে ৬ বছরেও কোনো কিস্তি পরিশোধ করেনি হবিগঞ্জের ইন্ডিভার।
সূত্র জানায়, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর বসতঘর বানানোর জন্য ১৯৯৭ সালে তহবিল গঠন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে স্টিয়ারিং কমিটি ওই তহবিলের তদারকি করছে। ওই তহবিল থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বিভিন্ন এনজিওকে ঋণ বিতরণের জন্য টাকা দেয়া হয়। শুরুতে তহবিলের আকার ছিল ৫০ কোটি টাকা। এ পর্যন্ত সরকার এ খাতে ৩শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। তার মধ্যে ১৬২ কোটি টাকা ছাড় করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এনজিওগুলো ২ শতাংশ সুদে তহবিল পায়। গ্রাহক পর্যায়ে তারা ৬ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়। ২২০ থেকে ৩০০ বর্গফুটের একটি ঘর বানানোর জন্য একজন গ্রাহককে সর্বোচ্চ ৭০ হাজার টাকা ঋণ দেয়া হয়। ১০ বছর মেয়াদে ঋণ পরিশোধ করার কথা। কিন্তু ঋণ নিয়ে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান উধাও হয়ে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ১০ বছরে ১ টাকাও পরিশোধ করেনি। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলাও করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওসব প্রতিষ্ঠান মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) মাধ্যমে লাইসেন্স নিয়ে কাজ করছিল।
সূত্র আরো জানায়, গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারি তহবিল থেকে বেসরকারি সেবা সংস্থাগুলোকে ১৮৮ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। যার মাধ্যমে সারা দেশে ৬৪ হাজার ১৬৯টি গৃহনির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশের ৫১৪টি এনজিও এই তহবিলের ঋণ বিতরণ করে আসছে। এছাড়া আরও ১০২টি এনজিও তহবিলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষ এমআরএর হিসেবে ৬৯২টি প্রতিষ্ঠানের ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের অনুমোদন রয়েছে। কিন্তু অনুমোদন ছাড়াও ৩০ হাজারের বেশি এনজিও ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করছে, যা একেবারেই অবৈধ।
এদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বেসরকারি ওসব প্রতিষ্ঠান কোন খাতে কত টাকা খরচ করছে, সে ব্যাপারে সরকারের নজরদারি বাড়াতে হবে। অন্যথায় বেসরকারি সেবা সংস্থাগুলোর অনিয়ম রোধ করা যাবে না। ঋণ বিতরণের আগে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা জরুরি। কিন্তু তা হচ্ছে না। ফলে কোনো তদবিরের কারণে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিলে তা আদায় করা সম্ভব নয়। ফলে ভালো উদ্দেশ্যে কর্মসূচি চালু হলেও শেষ পর্যন্ত এর সুফল আসে না। টাকা আদায়ের জন্য মামলা করা যায়। কিন্তু তাতে খুব বেশি সুফল পাওয়া যায় না। কারণ এরা বছরের পর বছর মামলা ঝুলিয়ে রাখে।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহাদাৎ হোসাইন জানান, শুধু বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে এনজিরও নজরদারি করছি। ঋণখেলাপি ওসব এনজিও এমআরএ থেকে লাইসেন্স নিয়েছে। তবে খেলাপি ৪৩টি প্রতিষ্ঠান এনজিও ব্যুরোর তালিকাভুক্ত। ওসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের বিষয়টি এমআরএ নজরদারি করছে। তবে খেলাপিদের তালিকা ব্যুরোর কাছে পাঠানো হয়।