March 24, 2026, 2:01 pm

সংবাদ শিরোনাম
রাস্তায় ‘মরণফাঁদ’—রংপুরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা সড়কের দায় কার? ঈদ যাত্রায় জনভোগান্তি নিরসনে সেনাবাহিনীর বিশেষ অভিযান শ্রম পরিদর্শন: লাইসেন্সে অস্বচ্ছতা, বোনাসে নীরবতা রসিক-এর পূর্ণকালীন প্রশাসক হলেন-আইনজীবী মাহফুজ-উন-নবী চৌধুরী আলুর লাভজনক দাম নিশ্চিত করা এবং সার নিয়ে দুর্নীতি, কালোবাজারী বন্ধ করে ভর্তুকি মূল্যে কৃষকের সার পাওয়ার নিশ্চয়তার দাবিতে রংপুরে কৃষক সংগঠনের বিক্ষোভ শ্রম পরিদর্শন না প্রহসন? বদর দিবস উপলক্ষে গঙ্গাচড়ায় আলোচনা সভা ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে রংপুর জেলার নব-নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের পরিচিতি সভা শ্রম পরিদর্শন না প্রহসন? ঈদের আগে হোটেল শ্রমিকদের বোনাস সংকটের ভেতরের গল্প একটি প্রজ্ঞাপন, বহু প্রত্যাশা: ঈদ বোনাসের অন্তরালের গল্প

যুদ্ধকালীন সময় ১৯৭১ সালের হামলা ও কিছু স্মৃতিময় কথা

বুলবুল আহমদঃঃ

হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার পূর্ব সীমান্ত কালাইনজুরা ও হলদারপুর গ্রাম।গ্রামটির পর্বপার্শ্ব দিয়ে বয়ে গেছে শাখা বরাক নদী। যা কালের আবর্তে আজ খালে পরিনত হয়েছে। এ গ্রামেই আস্তানা গড়ে ছিলেন ৩৬০ আউলিয়ার সফর সঙ্গী হযরত সৈয়দ ইলিয়াস (রহঃ) এর বংশধর মহান পূরুষ হযরত সৈয়দ শাহ আলমাছ খন্দকার (রহঃ) ওরফে কাজী খন্দকার। এই গ্রামেই জন্ম নিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখ সমরে শহীদ হওয়া হাবিবুর রহমান নানু। গ্রামের পশ্চিমে আমন ও বোর ধানের মাঠ। দক্ষিনে হলদারপুর গ্রাম ও উত্তরে শ্যামল ধানের মাঠ সহ অন্যান্য পল্লী গ্রাম। এক সময়ে এ গ্রামটি নবসনা গ্রাম হিসাবে অত্র অঞ্চলে পরিচিত ছিল। এ গ্রামে জন্ম নিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা ও অনেক গুনী জ্ঞানী। মুক্তযোদ্ধের সময় মরহুম বজলু মেম্বার সাহেবের বাড়ীতে ক্যাম্প করেছিল মুক্তিবাহিনী এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগীতা করেছিলেন এ গ্রামের প্রতিটি মানুষ। বলতে গেলে স্বাধীনতা যুদ্ধের স্বপক্ষের এটি একটি আদর্শ গ্রাম।

১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল- বাংলা মাসটি ছিল বৈশাখ মাস, মাঠে মাঠে বৈশাখী বোর ধানের মৌ মৌ গন্ধ। গ্রামের কৃষকেরা মাঠ থেকে ধান নিয়ে আসার জন্য ১০/১২ জনের একটি দল কাঁদে বেউ করে ধান নিয়ে আসার জন্য বাঁশের তৈরী দেখতে টিক রাইফেলের ন্যায়। তখন সবেমাত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। সকলের মধ্যে আতংক কখন যে কি হয়। মাঠ থেকে ধান নিয়ে আসার জন্য উলুবনের মধ্যদিয়ে একপায়া মেঠু পথ। কৃষক দল মাঠে যায় আমার সোনার বাংলা গান গায়, আবার কেহ সেই সময়ের জনপ্রিয় শ্লোগান জয়বাংলা, জয়বাংলা ধ্বনি দিয়ে মাঠের দিকে যায়। আবার কেউ কেউ কাঁদে বেউ নিয়ে একপায়া মেঠো পথে লাইন বেধে যাওয়াতে একটি প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের মত লাগত। বিমান/প্লেন দখলেই বিমানের দিকে বেউ তাক করে রাখে।

এ ব্যাপারে ঐ এলাকার সিন্ধু মনি চন্দ এর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি খুব ছোট ছিলাম। একদিন আমি ও আমার কাকাতো বোন আমাদের পার্শ্ববর্তী পুকুরের হাটু পানিতে ডানকিনে মাছ ধরছিলাম। হাঠাৎ করে তিনটি কাল বিমানের বিকট আওয়াজ করে দক্ষিন দিক হতে উত্তর দিকে উড়ে যায়। আবার ফিরে এসে ঘোরপাক খেল এবং দেখলাম তৈল জাতীয় পদার্থ পানির উপর ভেসে উঠল।আমরা দুজন ভয়ে পানি থেকে উঠে পাশেই আমার এক দাদীকে জড়িয়ে ধরলাম। উনি বোর ধান রাখার জন্য ছেঁড়া বস্তা পাট দিয়ে সলাই করছিলেন। গাছ-গাছালিতে ভরা কালাইনজুরা গ্রাম। সবেমাত্র বসন্তকাল শেষ হয়েছিল। গাছের পাতা পরে আবার শুকিয়ে ঝোঁপঝাঁড় ভরে আছে। সেখানে দেখলাম ঝোঁপঝাঁড়ে এ আগুন জ্বলছে। চতুর্দিকে মানুষের আর্তনাদ ও প্রাণ বাঁচানোর জন্য ছুটাছুটি করছিল। আমার বাবা দৌড়ে এসে আমরা সকলকে নিয়ে এ স্থান ত্যাগ করেন।যুদ্ধ বিমান ঘুরপাক দিচ্ছে এদিক হতে ঐদিক বৃষ্টির মত গুলি ছুঁড়ছে। মানুষ যে যেমনি ভাবে পারছে প্রাণ বাঁচানোর জন্য যার যার গন্তব্যে ছুটাছুটি করছে। আমাদের বাড়ীর পাশেই একটি মজাপুকুর রয়েছে। পুকুরের চারপাশ ছিল গাছগাছালিতে ভরা। আমাদের বাড়ীর সবাই পুকুরের উপর হেলে পড়া আমগাছের মূলে ধরে পানির মধ্যে বাঁদুরের মত ঝুঁলে আছি।হঠাৎ একটি কামানের গুলি গাছের বড় শাখা ছেদকরে আমাদের পাশেই পড়ল! কিন্তু কেউই হতাহত হয়নি। আমার জেটিমা ভয়ে উনার কুলে থাকা শিশুকে নিয়ে কখন যে পানিতে ডুব দিয়ে আছেন কোলে যে উনার ছোট কন্যা শিশু সে দিকে তিনির কোন খেয়াল নেই। উনার শ্বাস যখন প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল তখন তিনি পানির নিচে থেকে শিশুটিকে নিয়ে ভাসে ওঠেন। ততক্ষনে শিশুটি পানি খেয়ে মৃত প্রায়। এদিকে বিমান হামলায় মানুষ প্রাণ বাঁচানোর জন্য দিক বেদিক ছুঁটছে তারপর এই বিপদ কাটেনি। পরবর্তিতে শিশুটির পেট থেকে পানি বের করে বাঁচানো হয়। কিছুক্ষন পরই শুনি আমাদের পার্শবর্তী বাড়ীর নগরবাসী শুক্লবৈদ্যের স্ত্রী কামনের গুলি লেগেছে এবং শিশু কন্যা কামানের গুলিতে মারা গেছে।পাশেই মা বাসন্তী রানী বৈদ্য (৩২) গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছেন, গ্রামের একমাত্র ডাক্তার চান মিয়া চাচা ঐ ভদ্র মহিলার ব্যান্ডেজ করছেন পরবর্তীতে প্যারালাইজড অবস্থায় এই মহিলা কয়েক বছর কষ্টের সহিত জীবন সংগ্রাম করে মৃত্যুর কুলে ঢলে পড়েন।আমাদের একটি ছাগল কামানের গুলিতে পা হাড়িয়ে গাছের নিচে পড়ে আর্তনাদ করছে। প্রাণ হারিয়েছে আরও অনেক গবাদি পশু, তা আমি ও কাকাতো বোন যেখানে আমার দাদীকে জড়িয়ে ধরেছিলাম ঐ জায়গায় প্রায় পাঁচ হাত গর্ত হয়েছিল। ভাগ্যক্রমে ঐদিন আমরা বেঁচে গিয়েছলাম। তিনি আরো বলেন, পাক বিমান বৃষ্টির মত গুলি ছুঁড়েছে। বিমান হামলার পর কাঁদামাটি থেকে গ্রামের অনেকেই বিস্ফোরিত এবং অবিস্ফোরিত অনেক গুলি কুড়িয়ে ছিলাম। গুলির ওজন প্রায় ছিল দেড় থেকে দুই ছটাকের মতো। এ গুলি আজ আর নেই, থাকলে হয়ত মুক্তিযুদ্ধের যাদু ঘরে রাখা যেত। বিমান হামলার পর প্রতিটি বাড়ীতে মাটির নীচে গর্ত করে ভান্কার গড়ে তোলা হয়েছিল। বিমানের আওয়াজ পেলেই সবাই ভান্কারের ভিতর ডুকে যেত। সেইদিন ১৫/২০ মিনিটের একটি  বিমান হামলায় লন্ড ভন্ড করে দিয়েছিল কালাইনজুরা ও হলদার পুর গ্রাম।কালাইনজুরা গ্রামের পার্শ্ববর্তী গ্রাম খাগাুউড়া, এ গ্রামে জন্মগ্রহন করেন মুক্তিযুদ্ধের সেকেন্ড- ইন- কমান্ড এম,এ,রব। উনার গ্রাম ধারনা করেই হয়ত পাকবাহিনী সেদিন কালাইনজুরা  এবং হলদারপুর গ্রামে নির্বিচারে কামানের গুলি এবং গ্রেনেড ছুঁড়েছিল। ঐদিন বিমান হতে ছুঁড়া কামানের গুলি এবং গ্রেনেড হামলায় যারা মৃত্যুবরন করেন, তারা হলেন, কালাইনজুরা গ্রামের গৌরী রানী শুক্লবৈদ্বাদ্য, সন্তী শুক্লবৈদ্য (৩২), হলদারপুর গ্রামের মকবুলুন্নেছ (৩৫), আমিনা খাতুন (১২), সোনার মা (৩২), আঙ্গুরা খাতুন (৮), তৈয়বচান বিবি (৭০), লাল বিবি(৬০), নবীগঞ্জ থেক আসা আমিনা বিবি (৫২) কমলা বিবি সহ মাঠে থাকা ১২ জন ক্ষেত মজুর। এতে আহত হয়েছিলেন, হলদারপুর গ্রামের ফরিদা খাতুন, মমতাজ বেগম, শারবান বিবি, রেজিয়া খাতুন, এখলাছ বিবি, খোদেজা বিবি, আমিনা খাতুন, লতিফা খাতুন ও ফরিদা খাতুনের এক পা হাড়িয়ে এখন ও বেঁচে আছেন। তখন তার বয়স ৯ বছর ছিল। কামানের গুলিতে পা হারানোর পর তার আর বিয়ে হয়নি। অভাব অনটনে দিন কাটাচ্ছেন।শুনেছি বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষরকৃত ১টি অভিন্দন পত্র ও স্বাধীনতা উত্তর সরকারের নিকট থেকে একহাজার টাকা। সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় হতে পাঁচ হাজার ।

Share Button

     এ জাতীয় আরো খবর