মোহাম্মদ ইকবাল হাসান সরকারঃ
করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে পাল্টে দিয়েছে চলতি বাজেটের হিসাব-নিকাশ। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতায় শতভাগ বাজেট বাস্তবায়নে সৃষ্টি হয়েছে নানা শঙ্কা।বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কাটছাঁট করে সংশোধিত বাজেট চূড়ান্ত করা হয়েছে ৫ লাখ ১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা। অর্থবছরের শুরুতে ছিল ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২১ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা কমানো হল।আগামী জুনে এই সংশোধনী বাজেট প্রকৃত বাস্তবায়ন আশঙ্কাজনকভাবে কম হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদরা।এমনকি অর্থমন্ত্রী নিজেও এ পরিস্থিতি নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন।সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল প্রাইভেট ডিটেকটিভকে বলেছেন, চলতি অর্থবছরের রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে তিনি শঙ্কিত। কারণ চলছে বৈশ্বিক মহামারী করোনা। করোনার প্রাদুর্ভাবে আমদানি ব্যয় ও রফতানি আয়ের পরিমাণ গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কম হয়েছে। অর্থবছর শেষে এর পরিমাণ আরও কম হতে পারে। দীর্ঘ ছুটি বা কার্যত লকডাউনের (অবরুদ্ধ অবস্থা) ফলে রফতানিমুখী শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং কুটির শিল্পসহ উৎপাদনমুখী সব প্রতিষ্ঠানেই বিরূপ প্রভাব পড়েছে। চলমান মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন ও অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা দেরি হওয়ার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি এম মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম প্রাইভেট ডিটেকটিভকে বলেন, চলতি বাজেটে ২১ হাজার কোটি টাকার বেশি কাটছাঁট হলেও জুন শেষে প্রকৃত বাস্তবায়ন সংশোধিত বাজেটের চেয়ে আরও কম হবে। তিনি আরও বলেন, করোনায় ব্যয় বাড়ছে। রাজস্ব আহরণও কমছে। ফলে বাজেটের ঘাটতি আরও বেড়ে যাবে। ঘাটতি বাজেট পূরণে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেয়া আর সমীচীন হবে না। কারণ ইতোমধ্যে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে। এর কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমছে। এখন ঘাটতি মেটাতে সরকারকে বৈদেশিক ঋণ বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হবে। সবমিলিয়ে চলতি বাজেট বাস্তবায়ন এক রকম চাপের মুখে আছে।চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটের ব্যয়সীমা ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকা থেকে কাটছাঁট করা হয় ২১ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা। বছরের শুরুতে সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করা হয়। ফলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১১ কোটি টাকার মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। সংশোধিত বাজেটে মোট রাজস্ব আয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা। চলতি বাজেটে বৈদেশিক অনুদান পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৪ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা। সেটি সংশোধিত বাজেটে নামিয়ে আনা হয়েছে ৩ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা। অনুদানের লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়েছে ৭১৪ কোটি টাকা।বছরের শুরুতে সরকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল।এজন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি এডিপিতে বরাদ্দ দেয়া হয় ২ লাখ ২ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে সরকারের অস্বাভাবিক ব্যয় বেড়ে যায়।বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এডিপির অর্থ করোনা মোকাবেলায় ব্যয় করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।এরপর এটি কাটছাঁট করে সংশোধিত এডিপির আকার নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ৯২ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এডিপি কাটছাঁট করা হয়েছে ৯ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা।জানতে চাইলে সাবেক সিনিয়র অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ প্রাইভেট ডিটেকটিভকে বলেন, করোনায় সরকারের স্বাস্থ্য খাতসহ বেশকিছু ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ব্যয় বেড়েছে।পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবিরতার কারণে রাজস্ব আয় কমেছে। ফলে অর্থবছরের বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। এই সময়ে জিডিপি’র ৫ শতাংশের মধ্যে ঘাটতি বাজেট এ বছর রাখা অর্থ বিভাগের কাছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তবে এ বছর ঘাটতির পরিমাণ বাড়তে পারে, এতে সমস্যা হবে না।কারণ করোনার প্রভাবে সরকারের অপ্রত্যাশিত অনেক ব্যয় বেড়ে গেছে। উভয় সংকটের মধ্যে ঘাটতি পরিমাণ ঠিক রাখাই বড় কঠিন। তিনি আরও বলেন, অন্যান্য বছর জিডিপি’র ৫ শতাংশের মধ্যে ঘাটতি বাজেট নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হার অতিক্রম করে না।কিন্তু এ বছর তা অতিক্রম করতে পারে।ঘাটতি বাজেট : এ বছর বাজেটের ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।কারণ করোনার প্রভাবে বাজেটের হিসাব-নিকাশ পাল্টে গেছে। ফলে ঘাটতি বাজেট ঠিক রাখতে সরকার ব্যাংক ঋণনির্ভরতা বাড়িয়েছে, আর হ্রাস করা হয়েছে বৈদেশিক সহায়তা। অর্থ মন্ত্রণালয় ঘাটতি বাজেট সংশোধন করে ১ লাখ ৪০ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে। বছরের শুরুতে এটি ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ২১১ কোটি টাকা।সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।সাধারণ সরকারের ব্যয় ও আয়ের মধ্যে ব্যবধান হচ্ছে ঘাটতি। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার তিনটি খাত থেকে ঋণ গ্রহণ করে। প্রথম হচ্ছে ব্যাংক ঋণ, দ্বিতীয় হচ্ছে বৈদেশিক সহায়তা ও অন্যান্য উৎস। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ঘাটতি বাজেট পূরণ করতে বছরের শুরুতে সরকার ব্যাংক থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়। কিন্তু এখন সেটি বাড়িয়ে ৭২ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা নতুন করে ঋণ নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে অর্থ বিভাগ।এছাড়া ঘাটতি বাজেট মেটাতে বৈদেশিক খাত থেকে ৭৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার পরিকল্পান শুরু থেকে ছিল। কিন্তু সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৬৩ হাজার ৬৫৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। এতে কাটছাঁট করা হয়েছে ১১ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। বৈদিশক সহায়তা কমানোর কারণ হিসেবে বলা হয়, করোনাভাইরাসের প্রভাব বিশ্বব্যাপী মহামারী আকার ধারণ করেছে।ফলে অনেক দেশ নিজেদের অর্থনীতি সামাল দিতে গিয়ে ঋণ দেয়ার পরিমাণ কাটছাঁট করছে।তাদের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে এসব অর্থ ব্যবহার করা হচ্ছে। যে কারণে বৈদেশিক সহায়তা প্রত্যাশা অনুযায়ী পাওয়া যাবে না।সে প্রেক্ষাপট থেকে অর্থ বিভাগ বৈদেশিক সহায়তা কাটছাঁট করেছে।বাজেটের ঘাটতি মেটাতে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করে সরকার। তবে এ বছর শুরুতে ২৭ হাজার কোটি টাকা সঞ্চয়পত্র খাত থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ছিল।কিন্তু সঞ্চয়পত্র ক্রেতার অভাবে এটি কমিয়ে ১১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়।এ খাত থেকে সরকারের আয় কমে গেছে।তবে অন্যান্য খাত থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়।
প্রাইভেট ডিটেকটিভ/১৯ মে ২০২০/ইকবাল