April 10, 2026, 9:40 am

সংবাদ শিরোনাম
সাড়ে চার কোটি বিনিয়োগ নথি ঠিক, অদৃশ্য উৎস–আয়ের শেষ গন্তব্য কোথায়? রংপুরে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ আত্মীয়ের বাসা থেকে সাড়ে চার কোটির ছায়া: নথি ঠিক, উৎস অদৃশ্য নিজের অপরাধ আড়াল করতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অভিযোগ মেইন রাস্তার ধুলো নয়, নীরব বিষ: রংপুরে তামাক ক্রাসিংয়ের অবৈধ বিস্তার রংপুরে হামের ছায়া: সংখ্যা নয়, গল্পগুলোই বলছে আসল কথা দিনাজপুরে আশ্রম ও এতিমখানায় ৩ কোটি ৬২ লক্ষ ৮৮ হাজার টাকার চেক বিতরণ হাম-আতঙ্কের ভেতর পাঁচ শিশু, রমেকে নীরব লড়াই রংপুরে ”আলোকিতো’র প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালিত সাড়ে চার কোটির ছায়া: শ্বশুর সামনে, কাস্টমস্ জামাতার সংযোগ

ভর্তি বাণিজ্যসহ অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ সিরাজগঞ্জের নর্থ বেঙ্গল মেডিকেল কলেজের বিরুদ্ধে

মোঃ আব্দুল্লাহ আল শামীম সিরাজগঞ্জ জেলা প্রতিনিধিঃ

mostbet

সরকারী নীতিমালা লঙ্ঘন করে উত্তরবঙ্গে প্রতিষ্ঠিত প্রথম বেসরকারি নর্থ বেঙ্গল মেডিকেল কলেজের পরিচালক(প্রশাসন) আরমান আলী মিঠুর বিরুদ্ধে মেধা স্কোরকে পাশ কাটিয়ে ভর্তি বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে দীর্ঘ দিন ধরে তিনি ভর্তি বাণিজ্যের মাধ্যমে অঢেল অর্থ সম্পদের মালিক বনে গেছেন। ফলে দক্ষ ও যোগ্য চিকিৎসক তৈরির ক্ষেত্রে এ সিন্ডিকেটটি প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। সম্প্রতি এ প্রতিবেদকের তথ্য অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ভর্তি বাণিজ্যের ভয়াবহ চিত্র। জানা যায়, নর্থ বেঙ্গল মেডিকেল কলেজের পরিচালক ও সিন্ডিকেট প্রধান মো. আরমান আলী মিঠু তার অধিনস্ত সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার উৎপল কান্তি ঘোষ, সিনিয়র অফিস সহকারী সাইফুর রহমানসহ অন্যান্য স্টাফ ও দালালদের সমন্বয়ে গড়ে তুলেছেন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তিনি মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে মেধা স্কোর পাশ কাটিয়ে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি, ভুয়া বিল-ভাওচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাত, ইন্টার্ণশীপের জন্য সার্টিফিকেট নিতে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে অবৈধভাবে অর্থ আদায়সহ নানা অনিয়ম দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে প্রতি বছর হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা।  সম্প্রতি ভর্তি বাণিজ্য বিষয়ে কথা হয় প্রথম বর্ষের ছাত্র শাহরিয়ার ফারুকের বাবা সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ফুলকোচা গ্রামের আব্দুল হামিদের সাথে। তিনি জানান, আমার ছেলেকে ২০১৭-২০১৮শিক্ষাবর্ষে ভর্তি করাতে চার লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ছেলের মেরিট স্কোর কম হওয়ায় ভর্তি হওয়ার সুযোগ নেই বলে জানায় কলেজ কর্তৃপক্ষ। পরে নর্থ বেঙ্গল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের জুনিয়র টেকনিক্যাল এ্যাসিস্টেন্ট এহিয়া আকন্দ হীরা এবং সদর উপজেলার ফুলকোচা গ্রামের আবু বকর সিদ্দিকের ছেলে পল্লী চিকিৎসক ও ভর্তি বাণিজ্যের দালাল বলে পরিচিত ফরহাদ আলীর মাধ্যমে ঘুষ দিয়ে ছেলেকে ভর্তি করি। নর্থ বেঙ্গল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জুনিয়র টেকনিক্যাল এ্যাসিস্টেন্ট মনসুর আলী ও ক্যান্টিন ম্যানেজার শাহজাহান আলী জাহান জানান, ২০১৭-২০১৮ শিক্ষাবর্ষে টাঙ্গাইলের এক ছাত্রীকে(নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) ভর্তি করাতে ওই ছাত্রীর বাবার সাথে অতিরিক্ত চার লাখ টাকার বিনিময়ে ভর্তি করার চুক্তি করি। ওই ছাত্রীর মেরিট স্কোর কম হওয়ায় অফিসকে দুই লক্ষ টাকায় ম্যানেজ করে ভর্তি করি। বাকী টাকা আমরা এক লক্ষ করে দু’জনে ভাগ করে নেই। মনসুর আরও জানান, সামান্য বেতনে সংসার চলে না বিধায় প্রতিবছর কলেজ কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে ২/১জন করে ছাত্র ভর্তি করি। এছাড়া, একই শিক্ষাবর্ষে অস্বচ্ছল মেধাবী কোঠায় (ফ্রি কোঠা) ভর্তিচ্ছু ছাত্র পাবনা বেড়া থানার অনিন্দ্র কুমার দত্তের বাবা আনন্দ কুমার দত্ত বলেন- আমার ছেলে অস্বচ্ছল মেধাবী কোঠায় ২৬৮.৫ মেরিট স্কোর নিয়ে তালিকায় ১নম্বরে ছিলো। তালিকা অনুযায়ি এমনিতেই ভর্তি হওয়ার কথা। কিন্তু কলেজের লোকজন আমার কাছে ৫লাখ টাকা ঘুষ দাবী করেন। আমার আর্থিক অবস্থা ভালো নয় বিধায় টাকা দিতে না পারায় ছেলেকে ভর্তি করাতে পারিনি। তাড়াশ উপজেলার তৃতীয় বর্ষের ছাত্র জাহিদুল ইসলামের বাবা আব্দুল মান্নান জানান, ভর্তির নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ায় ছেলেকে সাধারণ কোঠায় ভর্তি করাতে না পেরে দালাল ধরে পরিচালক আরমান আলীকে অতিরিক্ত আট লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে বিদেশি কোঠায় ছেলেকে ভর্তি করি। একই বর্ষের আরেক ছাত্র সুব্রত বসাক জানান, সাধারণ কোঠায় ভর্তি হওয়ার সুযোগ না থাকায় বিদেশী কোঠায় ভর্তি করার জন্য আমার বাবার কাছ থেকে পরিচালক আরমান আলী ও সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার উৎপল পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই বর্ষের অপর একজন ছাত্র জানান, সাধারণ কোঠায় দ্বিতীয় মেধা তালিকায়(অপেক্ষমান) সর্বোচ্চ মেরিট স্কোর থাকা সত্বেও পরিচালক আরমান ও সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার উৎপল আমার কাছ থেকে ৫০হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। পরবর্তীতে ঘুষের টাকা না দিলেও মেরিট স্কোর অনুযায়ি ভর্তি হই। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, নর্থ বেঙ্গল মেডিকেল কলেজে সকল কোঠা মিলে মোট আসন সংখ্যা ৮৫টি। ২০১৭-২০১৮শিক্ষাবর্ষে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাধারণ কোঠায় প্রথম মেধা তালিকা থেকে ১১জন ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হয়। বাকী ৩৫টি আসন দ্বিতীয় মেধা তালিকা (অপেক্ষমান) থেকে নেয়ার কথা থাকলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ অনেক ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের জানিয়ে দেন প্রথম মেধা তালিকার সবাই ভর্তি হয়েছে, আসন ফাঁকা নেই। পরবর্তীতে ওই ফাঁকা আসনগুলো মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে পুরণ করা হয়। এমন ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায় পাবনার ভর্তিচ্ছু ছাত্র রফিকুল ইসলামের বড় ভাই জনির কাছ থেকে। তিনি জানান, দ্বিতীয় মেধা তালিকায় আমার ভাইয়ের মেধা স্কোর ছিলো- ২৪৫। অপেক্ষমান তালিকা থেকে ভর্তি শুরুর প্রথম দিন সকালে কলেজে গেলে সিনিয়র অফিস সহকারী সাইফুর রহমান বলেন- আপনার ভাইয়ের স্কোর কম। তাছাড়া, প্রথম মেধা তালিকা থেকে সবাই ভর্তি হয়েছে, আর কোন আসন ফাঁকা নেই। যে কারণে ভাইকে ভর্তি করাতে পারিনি। এছাড়া, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজের কর্মচারী এবং বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্রদের অনেকেই জানান- পরিচালক আরমান আলীকে ম্যানেজ না করে এ কলেজে ভর্তি হওয়া প্রায় অসম্ভব। তার হাতে গড়া সিন্ডিকেটটি প্রতিবছর ভর্তিচ্ছু ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের মন্ত্রী, এমপি, নেতাদের সুপারিশের দোহাইসহ নানা অজুহাত দেখিয়ে ভর্তি বঞ্চিত করে থাকেন। পরে কম স্কোরের ছাত্র-ছাত্রী ও তাদের অভিভাবকদের সাথে এ সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার উৎপল দরকষাকষি করে পরিচালক আরমান আলীর যোগসাজসে মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করে থাকেন। এ সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত রয়েছেন বেশ কয়েকজন রাঘব বোয়াল। তারা আরও বলেন, ব্যাপক ভর্তি বাণিজ্যের ফলে এ কলেজ থেকে প্রতিবছর অনেক অদক্ষ ও অযোগ্য চিকিৎসক বেরিয়ে আসছে। তারা আরও জানান, ২০০০সালে এই কলেজে ৬হাজার টাকা বেতনে স্টোর কিপার পদে চাকুরী পান বর্তমান পরিচালক আরমান আলী মিঠু। এরপর থেকে তিনি জড়িয়ে পরেন ভর্তি বাণিজ্যসহ নানা অনিয়ম দুর্নীতিতে। স্বল্প সময়ে হয়ে ওঠেন আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ। ইতিমধ্যে তিনি সিরাজগঞ্জ শহরের সয়াধানগড়া(নয়নমোড়) মহল্লায় ৯শতক জমি কিনে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেছেন চারতলা বিশিষ্ট সুদৃশ্য বিলাস বহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি। ভিতরে রয়েছে কোটি টাকা মূল্যের দৃষ্টি নন্দন আসবাবপত্র। এছাড়া, নিজের নামের পাশাপাশি নিকটজনদের নামে জেলার বিভিন্ন স্থানে কিনেছেন কমপক্ষে ২৫বিঘা জমি। উদ্ধার করেছেন বাবার বিক্রি করা জমিগুলোও। কিনেছেন একটি মাজদা ট্রাক। বিভিন্ন ব্যাংকের একাউন্টে জমিয়েছেন অবৈধ টাকার পাহাড়। ভর্তি বাণিজ্য ও অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়ে কলেজ পরিচালক আরমান আলী মিঠুর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে, কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. এএসএম আকরাম হোসেন বলেন, স্বচ্ছতার ভিত্তিতে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কোন অনিয়ম করা হয়নি।নর্থ বেঙ্গল মেডিকেল কলেজের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এমএ মুকিত বলেন, সবখানেই কমবেশী অনিয়ম দুর্নীতি আছে। এখানে নেই তা বলা যাবেনা। তবে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 

 

 

 

 

প্রাইভেট ডিটেকটিভ/২১মার্চ২০১৮/ইকবাল

Share Button

     এ জাতীয় আরো খবর