April 23, 2026, 9:46 pm

সংবাদ শিরোনাম
রংপুর পীরগাছার দেউতিহাট ইজারা নিয়ে নয়-ছয় ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে শীর্ষ অবস্থানে আলমগীর হোসেন ধনীদের সংখ্যা বাড়ছে: ৫ বছরে বিলিয়নিয়ার হতে পারে প্রায় ৪ হাজার রংপুর কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের শপিং কমপ্লেক্স, সংকুচিত সদস্যপদ আর বিস্তৃত ক্ষমতার এক অনুসন্ধান গাজীপুরে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি বন বিভাগের গেজেট থেকে অবমুক্তি প্রয়োজন রামুতে গাঁজাসহ দম্পতি আটক কাজের প্রলোভন দেখিয়ে অপহরণ, ৭ দিন পর ৩ যুবক উদ্ধার হিলিতে আধিবাসী উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিদ্যালয়ে এসএসসি’র দোয়া ও বিদায় অনুষ্ঠান মরিচের লাল রং মুছে গেলে যা থাকে এক্সিম ব্যাংকের প্রতারণার শিকার জামাল কন্সট্রাকশন কোম্পানির প্রোপাইটর

ধনীদের সংখ্যা বাড়ছে: ৫ বছরে বিলিয়নিয়ার হতে পারে প্রায় ৪ হাজার

mostbet

লোকমান ফারুক
২৩ এপ্রিল ২০২৬
যখন কোনো শহরের এক কোণে মা সন্তানের দুধের টাকার হিসাব মেলান, তখন পৃথিবীর অন্য প্রান্তে একজন ধনকুবের নিজের নতুন ইয়টের নকশা বাছেন। যখন কোনো কৃষক ঋণের চাপে জমির শেষ টুকরো বিক্রি করেন, তখন আরেকজন মানুষ মহাকাশ ভ্রমণের টিকিট কেনেন। এ দৃশ্য কেবল বৈপরীত্য নয়–এ আমাদের সময়ের আয়না। প্রশ্নটি তাই অর্থনীতির নয়, মানবতার: সম্পদ কি মানুষের সেবা করছে, নাকি মানুষই সম্পদের দাসে পরিণত হচ্ছে? বিশ্বজুড়ে ধনীদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। আর সেই বৃদ্ধির শব্দ সবচেয়ে আগে শোনা যায় না ব্যাংকের ভল্টে, শোনা যায় সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাসে।

আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস বলছে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বিশ্বে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজারে পৌঁছাতে পারে। আজ যেখানে সংখ্যা তিন হাজারের সামান্য বেশি, কাল সেখানে নতুন শত শত নাম যোগ হবে। যেন পৃথিবী এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতায় নেমেছে –কে দ্রুততম সময়ে সবচেয়ে বেশি শূন্য জড়ো করতে পারে। একজন অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন, “অর্থ যখন শ্রমের পুরস্কার, সমাজ তখন এগোয়। অর্থ যখন অর্থেরই চাকর, সমাজ তখন থেমে যায়।” আজকের বিশ্ব দ্বিতীয় পথে হাঁটছে। কারণ নতুন সম্পদের বড় অংশ তৈরি হচ্ছে কারখানার ঘামে নয়, পুঁজির গতিতে। একটি সফটওয়্যার, একটি অ্যাপ, একটি অ্যালগরিদম–এক রাতেই হাজার মানুষের বার্ষিক আয়ের চেয়েও বেশি মুনাফা তুলতে পারে।

ঢাকার এক তরুণ গ্রাফিক ডিজাইনার বলছিলেন,
“আগে কাজ মানুষ করত, এখন সফটওয়্যার করে। ক্লায়েন্ট বলে–কম খরচে, কম সময়ে, ভুলও কম।”
তার কথায় অভিযোগ কম, অনিশ্চয়তা বেশি।
এটাই নতুন যুগের কঠিন সত্য। প্রযুক্তি সম্পদ সৃষ্টি করছে, কিন্তু সেই সম্পদ কাদের হাতে জমা হচ্ছে? যারা প্রযুক্তির মালিক, না যারা প্রযুক্তির ধাক্কা সামলাচ্ছে?
যে অ্যাপ ডেলিভারি কর্মীর সময় মাপে, তার মালিকের সম্পদ বাড়ে। যে এআই লেখকের কাজ কমায়, তার বিনিয়োগকারীর শেয়ার বাড়ে। যে রোবট শ্রমিক কমায়, তার কোম্পানির মুনাফা বাড়ে। কিন্তু শ্রমিকের বেতন? প্রায়ই স্থির।

তেলের দেশ, প্রযুক্তির দেশ, টাকার দেশ, বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, সৌদি আরবে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা দ্রুত বাড়বে। পোল্যান্ড, সুইডেনেও নতুন ধনীদের উত্থান হবে। অর্থাৎ সম্পদের মানচিত্র বদলাচ্ছে। কিন্তু কেন্দ্র বদলালেই কি চরিত্র বদলায়? তেলের অর্থ, প্রযুক্তির অর্থ, খনিজের অর্থ–সবই যদি অল্প হাতে জমা থাকে, তবে সাধারণ মানুষ কেবল আলো দেখে, উষ্ণতা পায় না। মধ্যপ্রাচ্যের একজন বিশ্লেষক বলেছিলেন,”মরুভূমিতে টাওয়ার তোলা সহজ, ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠান তোলা কঠিন।” কথাটি শুধু মরুভূমির নয়, পুরো পৃথিবীর জন্য সত্য। ধনী হওয়া দোষ নয়, দায়হীন ধনী হওয়াই প্রশ্ন। সম্পদ সৃষ্টি অপরাধ নয়। উদ্ভাবন, উদ্যোগ, ঝুঁকি–এসবের পুরস্কার থাকা উচিত। যে শিল্প গড়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, সমাজকে এগিয়ে নেয়, তার সাফল্য স্বাভাবিক। কিন্তু সংকট শুরু হয় যখন–বাজারে প্রতিযোগিতা মরে যায়। করের ফাঁক দিয়ে সম্পদ পালায়। রাজনীতি অর্থের কাছে মাথা নোয়ায়। শ্রমের মূল্য কমে, পুঁজির মূল্য বাড়ে। তখন ধনী বাড়ে, কিন্তু সমাজ ছোট হয়ে যায়।

আজ তালিকায় আছেন এলন মাস্ক, ল্যারি পেজ, জেফ বেজোস। একসময় ছিল রেলপথের সম্রাট, পরে তেলের বাদশাহ, এখন ডেটার রাজা। মুখ বদলেছে, খেলা বদলায়নি। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে–যেখানে সম্পদ জমে, সেখানেই ক্ষমতা জমে। আর যেখানে ক্ষমতা জমে, সেখানে প্রশ্ন করার মানুষ কমে।

বিশ্বজুড়ে অতিধনীদের ওপর বেশি কর আরোপের দাবি বাড়ছে। কেউ বলছেন এতে বিনিয়োগ কমবে, কেউ বলছেন এতে সমাজ বাঁচবে। আসলে এটি টাকার হিসাব নয়, দায়ের হিসাব। রাস্তা, বিদ্যুৎ, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা, শ্রমবাজার–এসব ব্যবহার করেই তো ব্যবসা বড় হয়। তাহলে সমাজের প্রতি দায় থাকবে না কেন? একজন শিক্ষক বলেছিলেন, “গাছ যত উঁচু হয়, শিকড়ের কাছে তার দেনাও তত বাড়ে।”

বাংলাদেশেও নতুন ধনীদের সংখ্যা বাড়ছে। শহরে উঠছে কাঁচের টাওয়ার, রাস্তায় নামছে বিলাসবহুল গাড়ি, বাজারে বাড়ছে ব্র্যান্ডের ভিড়। কিন্তু একই দেশে– চাকরি খুঁজে তরুণ ক্লান্ত, কৃষক দামে হতাশ, মধ্যবিত্ত চাপে নীরব; নিম্নবিত্ত চিকিৎসা ব্যয়ে বিপর্যস্ত। এই বাস্তবতার শিক্ষা স্পষ্ট–আমাদের প্রবৃদ্ধি চাই, কিন্তু বৈষম্য নয়। প্রযুক্তি চাই, কিন্তু মানুষকে বাদ দিয়ে নয়।
ধনী চাই, কিন্তু দায়বদ্ধ ধনী। উন্নয়ন চাই, কিন্তু কেবল উপরের তলার জন্য নয়। নইলে শহর হবে এক–জীবন হবে দুই।

যদি পাঁচ বছরে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা ৪ হাজার হয়, পৃথিবী কি ততটাই ন্যায়বান হবে? শিশুরা কি ভালো স্কুল পাবে? রোগীরা কি চিকিৎসা পাবে? কৃষক কি পন্যের ন্যায্য দাম পাবে? শ্রমিক কি মর্যাদা পাবে?

ধনী বাড়ছে–এ খবরের আসল অর্থ তাই সংখ্যায় নয়, ছায়ায়। কারণ আলো যত বাড়ে, ছায়াও তত গাঢ় হয়।
একদিন মানুষ হয়তো জিজ্ঞেস করবে না–বিলিয়নিয়ার কতজন? জিজ্ঞেস করবে–এত সম্পদের পৃথিবীতে মানুষ এত গরিব কেন?

Share Button

     এ জাতীয় আরো খবর