/strong>
লোকমান ফারুক, রংপুর<
২০ এপ্রিল ২০২৬
তিস্তার চরে এ সময় মরিচক্ষেত মানে লাল রঙের উৎসব। কৃষকের ঘরে নগদ টাকা ঢোকার মৌসুম। বাজারে দর কষাকষি, উঠানে মরিচ শুকোনো, ঘরে নতুন টিন তোলার স্বপ্ন। কিন্তু রাজারহাটের চরাঞ্চলে এ বছর শেষ দৃশ্যটি দাঁড়াল অন্যরকম–কাদায় মিশে থাকা মরিচ, ভেঙে পড়া পেঁয়াজগাছ, আর হিসাবের খাতায় বাড়তে থাকা ঋণ।
ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের চরাঞ্চলে ঢুকতেই দেখা যায়, মাইলের পর মাইল সবুজ জমি। দূর থেকে মনে হয় প্রকৃতি উদার। কাছে গেলে বোঝা যায়, এই সবুজের নিচে চাপা পড়ে আছে বহু পরিবারের দুশ্চিন্তা। জমিতে এখনও গাছ আছে, কিন্তু ফল নেই। ফল আছে, কিন্তু দাম নেই। দাম থাকলেও বাজারে পৌঁছানোর ভরসা নেই।
কৃষক নুরুজ্জামান মাটিতে পড়ে থাকা মরিচ কুড়িয়ে হাতে নিলেন। বললেন, "এইগুলা আর বাজারে নেওন যায় না। গাড়িভাড়া দিমু, হাটে যামু, শেষে ফিরা আনতে হইব।" তার কণ্ঠে অভিযোগ কম, ক্লান্তি বেশি। উপজেলা কৃষি অফিস বলছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ৫৬৩ কৃষকের ফসল নষ্ট হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দুই কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের তালিকায় আছে ভুট্টা, চিনা, শাকসবজি, মরিচ, পেঁয়াজ ও কালোজিরা। কিন্তু তালিকায় নেই মানুষের মানসিক ক্ষতি, ধারদেনার চাপ, কিংবা সন্তানের স্কুলফি বাকি পড়ার কথা। চরের কৃষি এক ধরনের জুয়া–তফাত শুধু এই যে এখানে খেলোয়াড়ের হাতে তাস থাকে না।
মৌসুমের শুরুতে আবহাওয়া ভালো ছিল। কৃষকেরা ভেবেছিলেন, এ বছর ঘুরে দাঁড়াবেন। অনেকেই আগাম ঋণ নিয়ে বীজ, সার, কীটনাশক কিনেছেন। কেউ গরু বেচেছেন, কেউ স্বর্ণালঙ্কার বন্ধক রেখেছেন। তারপর একদিন শিলাবৃষ্টি নামে। আরেকদিন অতিবৃষ্টি। এরপর বাজারে হুড়মুড় করে দাম পড়ে। কৃষক রওশন আরা বেগম বললেন, "আকাশে বৃষ্টি, বাজারে মন্দা-দুই দিক থেইকা মার খাইছি।" কারণ দুর্যোগ ঠেকানো সম্ভব নয়, কিন্তু ক্ষতি কমানো সম্ভব। আগাম আবহাওয়া সতর্কবার্তা, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে হস্তক্ষেপ, সহজ শর্তে পুনঃঋণ-এসব রাষ্ট্রের কাজ। প্রশ্ন হলো, দুর্যোগের পরে মাঠে কারা আগে পৌঁছায়–সহায়তা, না শুধু পরিসংখ্যান?
রাজারহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফন্নাহার সাথী বলেছেন, কিছু ক্ষতি হলেও কৃষকেরা পরিশ্রম দিয়ে তা পুষিয়ে নিতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
আশা অবশ্য কৃষকের পুরোনো সম্পদ। রাষ্ট্রের নয়।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, তিস্তার চরাঞ্চলে চলতি মৌসুমে ৮ হাজার ৫২৮ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ফসলের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ৫১৭ দশমিক ৫ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ২৯৬ হেক্টরের ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট। উৎপাদন কমতে পারে প্রায় ৩ হাজার ২২ দশমিক ৮২ টন।
এক কৃষক পরিবারে দুপুরে ভাতের সঙ্গে শুধু লবণ আর কাঁচা পেঁয়াজ। গৃহকর্ত্রী বললেন, "মরিচ বেচা টাকায় বাজার করমু ভাবছিলাম। এখন মরিচও নাই, টাকাও নাই।" বাংলাদেশে কৃষককে আমরা সম্মান করি ভাষণে, ব্যবহার করি অর্থনীতিতে, ভুলে যাই বিপদে।
তিস্তার চর আবার সবুজ হবে। কৃষক আবার বীজ ফেলবেন। কারণ মাটি ছাড়া তার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়–যে মানুষ ঝড়ের মধ্যেও দেশকে খাদ্য দেয়, দুর্যোগের দিনে রাষ্ট্র তার পাশে দাঁড়াবে তো?