March 26, 2026, 2:00 am

সংবাদ শিরোনাম
এক-এগারোর ছায়া: বন্ধ দরজার ভেতর থেকে উঠে আসা নাম—মাসুদ রাস্তায় ‘মরণফাঁদ’—রংপুরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা সড়কের দায় কার? ঈদ যাত্রায় জনভোগান্তি নিরসনে সেনাবাহিনীর বিশেষ অভিযান শ্রম পরিদর্শন: লাইসেন্সে অস্বচ্ছতা, বোনাসে নীরবতা রসিক-এর পূর্ণকালীন প্রশাসক হলেন-আইনজীবী মাহফুজ-উন-নবী চৌধুরী আলুর লাভজনক দাম নিশ্চিত করা এবং সার নিয়ে দুর্নীতি, কালোবাজারী বন্ধ করে ভর্তুকি মূল্যে কৃষকের সার পাওয়ার নিশ্চয়তার দাবিতে রংপুরে কৃষক সংগঠনের বিক্ষোভ শ্রম পরিদর্শন না প্রহসন? বদর দিবস উপলক্ষে গঙ্গাচড়ায় আলোচনা সভা ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে রংপুর জেলার নব-নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের পরিচিতি সভা শ্রম পরিদর্শন না প্রহসন? ঈদের আগে হোটেল শ্রমিকদের বোনাস সংকটের ভেতরের গল্প

এক-এগারোর ছায়া: বন্ধ দরজার ভেতর থেকে উঠে আসা নাম—মাসুদ

লোকমান ফারুক,রাতটা ছিল অস্বাভাবিকভাবে নিঃশব্দ। ঢাকার বারিধারা ডিওএইচএস—যে এলাকা সাধারণত সুরক্ষিত, নীরব, প্রায় নির্বিকার—সেই রাতেই হঠাৎ কড়া নাড়ে রাষ্ট্র। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ভেতরে ছিলেন একজন মানুষ, যিনি একসময় দরজা খুলতেন—রাষ্ট্রের জন্য, ক্ষমতার জন্য, কখনো হয়তো অদৃশ্য নির্দেশের জন্য।
সেই মানুষ—মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। দরজা খুলতেই ইতিহাস যেন হালকা কাশি দিল।

ওয়াশিংটনের সাংবাদিকরা যাকে বলে—কাগজের পথ, (ঘটনার পেছনে রেখে যাওয়া লিখিত প্রমাণের ধারাবাহিকতা) বাংলাদেশে তার গন্ধ পাওয়া যায় ফিসফিসে কথোপকথনে, পুরনো ডায়েরির পাতায়, আর অর্ধেক বলা গল্পে। একজন সাবেক আমলা, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বলছিলেন—”২০০৭ সালের পর আমরা ফাইল নিয়ে কাজ করতাম না, ফাইল আমাদের নিয়ে কাজ করত।” তার চোখে ক্লান্তি ছিল, ভয় ছিল না। হয়তো সময় ভয়কে পুড়িয়ে ফেলেছে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি—যা এখন শুধু একটি তারিখ নয়, বরং এক ধরনের রাজনৈতিক ছায়া—সেই সময়কার পটভূমিতে উঠে আসে কয়েকটি নাম। তাদের একজন ছিলেন মাসুদ। তখন তিনি সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসি। কিন্তু কিছু সূত্র বলছে, পদবী ছিল আড়াল—ভূমিকা ছিল আরও বেশি।

কে এঁকেছিল সেই নকশা? একটি কফি শপে বসে একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা বলেছিলেন—”সবকিছু পরিকল্পিত ছিল না। কিন্তু যখন পরিকল্পনা শুরু হলো, তখন কেউ থামাতে পারেনি।” এই ‘পরিকল্পনা’র কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন দুই ব্যক্তি—মঈন উ আহমেদ এবং ফখরুদ্দীন আহমদ। তাদের চারপাশে তৈরি হয়েছিল এক অদৃশ্য বলয়—সামরিক, আমলাতান্ত্রিক, এবং তথাকথিত ‘সুশীল’ শক্তির মিশ্রণ। মাসুদ ছিলেন সেই বলয়ের কার্যকর হাত।

তৎকালীন সময়ের একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ ছিল —’অভিযান’। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান। কিন্তু একজন ব্যবসায়ী, যিনি সেই সময় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, বললেন—”আমরা বুঝতে পারছিলাম না—আমরা আসামি, না কি আমরা একটি স্ক্রিপ্টের চরিত্র।” এই ‘স্ক্রিপ্ট’ পরিচালনা করত একটি কমিটি—’গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’—যার সমন্বয়ক ছিলেন মাসুদ। একজন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেছেন—”তালিকা তৈরি হতো। নাম আসত। তারপর মিডিয়ায় যেত। তারপর গ্রেপ্তার।” একটি যান্ত্রিক প্রক্রিয়া। যেন মানুষ নয়, ফাইল সরানো হচ্ছে।

সাংবাদিকতার একটি পুরনো প্রশ্ন—আমরা কি সত্য দেখাই, না কি সত্য তৈরি করি? এক-এগারোর সময়, এই প্রশ্নটি হয়ে উঠেছিল আরও তীক্ষ্ণ। একজন সম্পাদক, পরে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় স্বীকার করেছিলেন—”আমরা যাচাই করিনি। সময় ছিল না। চাপ ছিল।” এই ‘চাপ’ কোথা থেকে আসত? উত্তর কেউ সরাসরি দেয় না। কিন্তু নামগুলো ঘুরে ফিরে আসে—একটি সংস্থার কিছু গোয়েন্দা, বিশেষ ইউনিট, এবং কিছু নির্দিষ্ট কর্মকর্তা।

তখনকার রাজনীতির দুই মেরু—বেগম খালেদা জিয়া এবং সে সময়ের আরেক নেতৃত্ব—শেখ হাসিনা—দুজনই সেই সময় রাষ্ট্রীয় কঠোরতার মুখোমুখি হন। কিন্তু এই গ্রেপ্তারের তালিকায় একটি নাম ছিল ভিন্নভাবে আলোচিত—তারেক রহমান। তার ক্ষেত্রে বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক ছিল না—এটি ছিল ব্যক্তিগত, শারীরিক, এবং গভীরভাবে অমানবিক।

প্রায় ষোলশত কোটি টাকা—কাগজে এটি একটি সংখ্যা হলেও, বাস্তবে এটি ছিল অসংখ্য ব্যবসা, শ্রমিক আর পরিবারের জীবনের ভার। একজন শিল্পপতি নিঃসংকোচে বলেছিলেন—”আমরা টাকা দিতাম, কারণ আমরা বাঁচতে চাইতাম।” পরিস্থিতি এমন ছিল—টাকা দেওয়া ছিল বাধ্যতা, না দিলে টিকে থাকাই কঠিন। পরবর্তীতে সর্বোচ্চ আদালত এই অর্থ আদায়কে অবৈধ ঘোষণা করে।
তবু প্রশ্নটা থেকে যায়—যা নেওয়া হয়েছিল, তা কি ফেরত এসেছে?

২০১৮ সাল, নাটকীয়ভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন মাসুদ। একজন রাজনীতিক হেসে বলেছিলেন— “বাংলাদেশে রাজনীতি নদীর মতো—আজ এই পাড়, কাল ওই পাড়।” আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি—দুই দিকেই পদচারণা। তারপর সংসদ সদস্য। একসময় যিনি ‘ব্যবস্থা’র অংশ ছিলেন, পরে হয়ে উঠলেন ‘ব্যবস্থা’র সুবিধাভোগী। বৈপরীত্য? না কি তা স্বাভাবিক?

২০২৬ সালের মার্চ। ১৯ বছর পর। একটি দরজা আবার খুলল—কিন্তু এবার উল্টো দিকে। একজন তরুণ কর্মকর্তা বললেন—”আমরা শুধু দায়িত্ব পালন করেছি।”
কিন্তু ইতিহাস দায়িত্ব দিয়ে লেখা হয় না—লেখা হয় দায় দিয়ে। তারপরও প্রশ্নগুলো এখনো বেঁচে আছে, মাসুদ কি একা? না কি তিনি একটি বৃহত্তর কাঠামোর অংশ?
যদি কাঠামো থাকে—তাহলে সেটি কোথায়? কারা তার ভেতরের অংশ? একজন প্রবীণ সাংবাদিক বললেন—
“আমরা নাম জানি। কিন্তু নাম বলা আর প্রমাণ করা—দুটো আলাদা জিনিস।” মাসুদের গ্রেপ্তার একটি ঘটনা। কিন্তু এটি কি একটি সূচনা? বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘এক-এগারো’ শুধু একটি তারিখ নয়—এটি জোর করে একটি ইতিহাস বদলে দেওয়ার ঘটনা। রাষ্ট্র বনাম নাগরিক। ক্ষমতা বনাম জবাবদিহি।

একটি তদন্ত কমিশনের দাবি উঠছে। কিন্তু কমিশন কি সত্য খুঁজবে, না কি সত্যকে সাজাবে? শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সহজ—দরজা কি শুধু একজনের জন্য খুলেছে, না কি পুরো করিডরটাই জনগণের সামনে আলোকিত হবে? এই গল্পের শুরু হলেও শেষ এখনো হয়নি।
কারণ, কিছু ফাইল এখনো খোলা হয়নি।
আর কিছু দরজা—এখনো ভেতর থেকে বন্ধ।

Share Button

     এ জাতীয় আরো খবর