পিডিনিউজ ডেক্সঃ
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আজাদ বখত উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের সাবেক প্রধান শিক্ষক মোঃ হাবিবুর রহমানের পদত্যাগের প্রায় এক বছর পার হলেও তাকে ঘিরে বিতর্ক থামেনি। বরং পদত্যাগের আগে-পরে সংঘটিত একাধিক আর্থিক লেনদেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের অসংগতি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে অনিয়মের অভিযোগ, আর তার মধ্যেই পুনরায় দায়িত্বে ফেরার চেষ্টা চলছে—এমন অভিযোগও সামনে আসছে।
প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক নথি অনুযায়ী, ২৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে সাবেক প্রধান শিক্ষক উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও গভর্নিং বডির সভাপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরদিন প্রতিষ্ঠানের চেক, এফডিআর, ব্যাংক হিসাবের কাগজপত্র এবং বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের আইডি ও পাসওয়ার্ড উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
২৭ আগস্ট তিনি শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে পুনরায় পদত্যাগপত্র জমা দেন, যা গভর্নিং বডির সভায় অনুমোদিত হয়। এরপরই তাকে এমপিও তালিকা থেকে নাম কর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—পদত্যাগের আগেই কেন কোনো রেজুলেশন ছাড়াই প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে অর্থ উত্তোলন করা হলো?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এলজিএসপি-৩ (পিবিজি) প্রকল্পের আওতায় ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়া ২ লাখ ১৫ হাজার টাকার ‘বায়োমেট্রিক হাজিরা ও সফটওয়্যার ম্যানেজমেন্ট’ প্রকল্প আজও সম্পূর্ণ হয়নি। অথচ পুরো অর্থ উত্তোলনের প্রমাণ মিলেছে। বায়োমেট্রিক যন্ত্রাংশ বা সফটওয়্যার ব্যবহারের কোনো কার্যকর রেকর্ড প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ দেখাতে পারেনি।
২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত উন্নয়ন কাজের নামে সাধারণ তহবিল থেকে প্রায় ৩৫ লাখ টাকার বেশি অর্থ উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি এবং বাস্তবে দৃশ্যমান উন্নয়ন কাজের চিহ্নও নেই। ব্যয়ের ভাউচার থাকলেও কাজের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষক ও অভিভাবকরা
মাছ, নৌকা ও মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন সামগ্রী প্রতিষ্ঠানের অর্থে কেনা হলেও তা এখনো প্রতিষ্ঠানে জমা নেই—এমন অভিযোগ রয়েছে। নোটিশ দেওয়ার পরও এসব সামগ্রী ফেরত আসেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছ।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এটি প্রথমবার নয়। ২০১২ সালে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে উপজেলা প্রশাসনের তদন্ত হয় এবং বিষয়টি তখন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকেও প্রকাশিত হয়েছিল। ২০১৫ সালে শিক্ষা অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে। একই সময়ে শিক্ষার্থী নির্যাতনের অভিযোগে মানববন্ধনের ঘটনাও ঘটে।
স্থানীয় সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক প্রধান শিক্ষক পুনরায় দায়িত্বে ফেরার লক্ষ্যে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন। যদিও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে বিষয়টি গভর্নিং বডি ও প্রশাসনের নজরে এসেছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
গভর্নিং বডির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“প্রধান শিক্ষক দীর্ঘদিন দায়িত্বে ছিলেন। তিনি যদি অনিয়ম করে থাকেন তবে এর দায়ভারও তাঁকেই নিতে হবে। প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি সম্পদ শিক্ষার্থীদের কল্যাণের জন্য, ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়।”
বিদ্যালয়ের কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অভিযোগ প্রমাণিত হলে তারা কঠোর ব্যবস্থা চান।
অভিভাবক রুবেল মিয়া বলেন,
“আমাদের সন্তানদের শিক্ষার মান উন্নত করার বদলে যদি টাকা দুর্নীতি হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ। আমরা চাই তদন্ত সঠিকভাবে হোক।”
অন্যদিকে স্থানীয় আরেক অভিভাবক রহমত আলী বলেন,“আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম প্রধান শিক্ষক অসুস্থ হয়ে চলে গেছেন। এখন যদি দেখা যায় এত টাকার হিসাব নেই, তবে শিক্ষার্থীদের সামনে ভুল বার্তা যাবে।”
এ নিষয়ে মৌলভীবাজার জেলা শিক্ষা অফিসার (DEO)মোহাম্মদ ফজলুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি ,বিষয়টি তদন্তাধীন আছে বলে জানান। এর বেশী কিছু বলতে চাননি তিনি।
“উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা জানতে ও সংবাদের সত্যতা যাচাইয়ে হোয়াটসঅ্যাপ মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সাবেক প্রধান শিক্ষক হাবিবুর রহমানের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।”
একজন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের বিরুদ্ধে যদি একের পর এক আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, তবে দায় কার? প্রশাসনের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত কি এই প্রশ্নের উত্তর দেবে, নাকি বিষয়টি আবারও আপস-মীমাংসার মধ্যেই হারিয়ে যাবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।