নিজস্ব প্রতিবেদক
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার নারায়ণপুর গ্রাম—শান্ত জনপদ, সবুজে ঘেরা। নিঃসন্তান দম্পতি আমিনুর রহমান বকুলের জন্য এই গ্রামের এক টুকরো জমি ও পুকুর ছিল দীর্ঘদিনের ভরসা, সংসারের একমাত্র নিরাপদ ঠিকানা। অথচ সেই জলাশয়ই এখন পরিণত হয়েছে ভয় ও উৎকণ্ঠার কেন্দ্রবিন্দুতে।
বছর কয়েক আগে এক নম্বর খাস খতিয়ান থেকে জমি কিনে খাজনা-খারিজ ও জরিপ পর্চা করে দখল নেন আমিনুর। জমির বৈধ কাগজপত্র হাতে নিশ্চিন্ত ছিলেন তিনি। কিন্তু গ্রামেরই ইয়াকুব আলী শাহ ১৩৬০ খতিয়ানভুক্ত ২.৯৬ একর জমি নিজের নামে ভুয়া এসএ ১৪ নম্বর খতিয়ান তৈরির মাধ্যমে দাবি করে বসেন। শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই।
চলতি বছরের ৭ জুলাই আদালত প্রথম রায় দেন ইয়াকুব আলীর পক্ষে। সেই রায়ের বিরুদ্ধে ২০ আগস্ট দিনাজপুর জেলা জজ আদালতে আপিল করেন আমিনুর। অভিযোগ, তখনই তিনি থানাকে সবকিছু জানান ও আইনি সহায়তার অনুরোধ করেন।
২০২৩ সালের ৪ ডিসেম্বর ইয়াকুব আলীর মৃত্যু হয়। কিন্তু মামলা থেমে থাকেনি। বরং নতুন রূপে হাজির হয় পুরনো দ্বন্দ্ব। ইয়াকুব আলীর দুই ছেলে—রেজওয়ানুল হক মিলন ও যশোরে ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তা আশিকুর রহমান (ভিক্টর)—স্ত্রী ও এক কন্যা মিলে বাবার দাবি আঁকড়ে ধরেন।
আমিনুরের অভিযোগ, ৩০ আগস্ট থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি। এরপর ১১ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে শতাধিক লোক নিয়ে ওই দুই ভাই অতর্কিতে হামলা চালায়। পাহারাদারের ঘরে ধারালো অস্ত্রের কোপ, পুকুরের পাড় কেটে মাছ পাশের পুকুরে নামানোর চেষ্টা—গ্রামের নির্জন রাত মুহূর্তেই রণক্ষেত্র।
টহল পুলিশ এসে প্রথমে ধাওয়া দিলে হামলাকারীরা পালায়, কিন্তু আধঘণ্টা পর আবার ফিরে লুটপাট চালিয়ে মাছ তুলে নেয়।
১২ সেপ্টেম্বর থানায় এজাহার করেন আমিনুর। তবু এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তদন্তের কোনো অগ্রগতি নেই।
আমিনুরের ভাষায়, “আমি বৈধভাবে জমি কিনেছি, খাজনা দিয়েছি, দখল আমার। তবু বারবার হামলার শিকার হতে হচ্ছে।”
ইতিমধ্যে মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার জন্য জজ আদালতে আবেদন প্রস্তুত করেছেন তিনি। আশা রাখেন, উচ্চ আদালত ন্যায়বিচার দেবেন এবং ভুয়া দলিল তৈরির এই নাটকের অবসান ঘটবে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, জীবদ্দশায় ইয়াকুব আলী জমি নিয়ে একাধিক জটিলতা তৈরি করেছিলেন। এখন তার ওয়ারিশদের তৎপরতায় গ্রামের চায়ের আড্ডা থেকে মাঠের আল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে উৎকণ্ঠা।
পুকুরের নীরব জল আজও বিকেলের সোনালি রোদে ঝলমল করে, কিন্তু আমিনুর-বকুল দম্পতির চোখে সেই জল যেন এক অদৃশ্য ভয় আর অশান্তির প্রতিচ্ছবি—যেখানে শান্তি ফিরে আসার অপেক্ষা যেন শেষই হচ্ছে না।