মোঃ ওমর আলী ভূঁইয়া সিরাজগঞ্জ জেলা ব্যুরো প্রধানঃ
নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা ও বাল্যবিয়ে রোধে অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন সিরাজগঞ্জ জেলার প্রথম নারী জেলা প্রশাসক কামরুন নাহার সিদ্দীকা। প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে বদলি হয়ে ২০১৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক হিসেবে সিরাজগঞ্জ জেলায় যোগ দেন তিনি। এরপর থেকেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন প্রতিটি উপজেলা এমনকি দুর্গম চরাঞ্চলেও। জেলার কোথাও বাল্যবিয়ের খবর পেলেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মত-বিনিময়ও করছেন তিনি।
৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক কামরুন নাহার সিদ্দীকার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। জানা যায়, এ নারী সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসকের অনুপ্রেরণার গল্প।
কামরুন নাহার সিদ্দীকার জন্ম টাঙ্গাইল জেলার ভূঞাপুরে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। বাবা এম এ কাদের মিঞা এবং মা নাজমুন নাহারই তার অনুপ্রেরণা। বেড়ে উঠেছেন রাজধানী ঢাকায়। ঢাকার মোহাম্মদপুর কিশোলয়া গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি ও হলিক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। রসায়ন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করার পর যোগ দেন বিসিএস ১৭তম ব্যাচে।
কাজের ফাঁকে এমবিএ করার পর শিক্ষাগ্রহণ করেছেন যুক্তরাজ্যের উলভারহ্যামটন ও অস্ট্রেলিয়ার মোনাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ব্যক্তি জীবনে দু’সন্তানের মা তিনি। লেখালেখিতেও হাত আছে তার। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও লিখতে শুরু করেছেন কাছের মানুষদের অনুরোধে। দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, জীবন, প্রকৃতি, নারী অধিকার ও সমকালীন বিষয় তার কবিতায় প্রকাশিত হয়েছে। নব্বইয়ের দশক থেকে বর্তমান সময়ের ব্যক্তিগত অনুভূতি নিয়ে লিখেছেন কবিতার বই ‘অনুভূতির অষ্টপ্রহর’।
তিনি জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদানের পর কালেক্টরেট প্রশাসনিক ভবনের প্রশাসনিক শাখায়ও স্বচ্ছতা এসেছে। জেলা প্রশাসক ভবনের সামনেই বর্তমানে শোভা পাচ্ছে ব্যানার। তাতে জেলা প্রশাসকের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখা আছে ‘আমি ও আমার প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিমুক্ত’।
সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক কামরুন নাহার সিদ্দীকা বলেন, ‘বাল্যবিয়ে একজন নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়নের অন্তরায়। প্রধানমন্ত্রীর সবকটি পদক্ষেপের মধ্যে অন্যতম বিশেষ উদ্যোগ হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন। বাল্যবিয়ে বন্ধের বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার। ২০২১ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ে শুন্যে নামিয়ে নিয়ে আসবেন- এ প্রত্যয় নিয়ে কাজ করছে তিনি। আর ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সের শিশুদের বাল্যবিয়ের হার এক-পঞ্চমাংশে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছেন। বর্তমানে ইউনিসেফ জরিপে এটি শতকরা পঞ্চাশ ভাগ আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিরাজগঞ্জ জেলা একটি ব্যতিক্রমী জেলা। এখানে নদী ভাঙন যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে চরাঞ্চল। ৯ উপজেলার মধ্যে ৪টিতে প্রায় প্রতি বছরই বন্যা হয়। স্থায়ীভাবে বসবাসের আগেই বন্যা ও যমুনার ভাঙনে অন্যত্র সরে যেতে হয়, আত্মীয়তার বন্ধনও ভেঙে পড়ে। ফলে নারী, শিশুদের লেখাপড়ায়ও বিঘ্ন ঘটে। আর এ কারণে বাল্যবিয়ের হারও বেড়ে যায়। গত জেএসসি পরীক্ষায় নারী শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ অনুপস্থিত ছিল। এর কারণ অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাল্যবিয়ের শিকার হওয়ায় তারা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। আমি এখানে জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদানের পর সব স্তরের লোকজনকে নিয়ে বেশ ক’টি জনসচেতনামূলক কর্মশালা করতে পেরেছি। আগামীতে অভিভাবকদের এ বিষয়ে আরও সচেতন করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, আমরা খবর পেলেই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বাল্যবিয়ে বন্ধ করে আসছি।’
প্রাইভেট ডিটেকটিভ/৯মার্চ২০১৮/ইকবাল