আব্দুস সামাদ আজাদ,
কুশিয়ারার বুক যেন বিকেলের আলোয় এক বিশাল উৎসবমঞ্চ। বৈঠার ছন্দে, ঢোল-তবলার ঝংকারে, আর মাঝিদের গলায় ভেসে আসা লোকগানে চারপাশ তখন মাতোয়ারা। কে গাইছে—“কোন মেস্তরী নাও বানাইচে কেমন দেখা যায়, ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নায়ৃ”গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নদীর জলে যেনও নেচে ওঠে ঢেউ।শুক্রবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার শেরপুরে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা। দুপুর থেকে নদীর তীর জুড়ে ভিড় জমতে থাকে মানুষে মানুষে। বিকেল নাগাদ কুশিয়ারার দুই পাড় হয়ে ওঠে জনসমুদ্রে ভাসমান। শিশু, তরুণ, বৃদ্ধ, নারী—সবাই যেনো এই আনন্দযজ্ঞের অংশীদার।
বৈঠা যখন একসঙ্গে পড়ে নদীর বুকে, তখন তরঙ্গ তৈরি হয় ঢেউয়ের পর ঢেউ। ঢোল বাজে, খোল-করতাল কাঁপে, আর দর্শকদের করতালি মিশে যায় সেই সুরে। নৌকা ছুটে চলে রাজহাঁসের মতো, আর ভেসে আসে মাঝিদের গান—‘ছাড়িলাম হাসনের নাওরেৃ’। এক মুহূর্তের জন্য বোঝার উপায় নেই কে কোন নৌকার সমর্থক, কারণ সবার চোখে তখন কেবল আনন্দ, সবার কণ্ঠে কেবল হর্ষধ্বনি।সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার মোট ১০টি নৌকা অংশ নেয় এই প্রতিযোগিতায়।
কানাইশার তরী-, ভল্লবপুর ,এসকের তরী- গোতগাও ,ইব্রাহিমশার তরী- জাগিরপুর , নগর পবন- শান্তি গঞ্জ ,আইয়ুবশার তরী – পাইকাপন( শান্তি গঞ্জ) ,মরমআলীর তরী -বাগাউড়া নবীগঞ্জ ,ইশানের তরী(১)- মিলিক জগন্নাথপুর ,ইশানের তরী(২) -মিলিক ,লিলুশার তরী -ফিরোজপুর গ্রাম ,বাংলার তোফান সরিষপুর- ওসমানী নগর ,এমন নানা নামের নৌকা ছুটে চলে নদীর প্রশস্ত বুকে।
প্রতিটি বৈঠার কোপ যেন দর্শকের মনে জাগিয়ে তোলে নতুন উত্তেজনা।আলীপুর থেকে শেরপুর লঞ্চঘাট পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার পথজুড়ে চলে এ বাইচ। ছয় ধাপের প্রতিযোগিতার শেষে চূড়ান্ত পর্বে তিনটি নৌকা অংশ নেয়। তাতে—চ্যাম্পিয়ন: মরম আলী তরী বাগাউড়া নবীগঞ্জ রানার্সআপ:এসকের তরী।তৃতীয়: কানাইশার ভল্লবপুর ওসমানী নগর চতুর্থ: ঈশানের তরী জগন্নাথপুর।
হামরকোনা গ্রামবাসী আয়োজিত নৌকা বইচ প্রতিযোগীতায় পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় ব্যবসায়ী খলিলপুর ইউনিয়ন বিএনপির অর্থ- সম্পাদক কর্নেল আহমদ। প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এম নাসের রহমান এসময় উপস্থিত ছিলেন- ফয়জুল করিম(ময়ূন) আহ্বায়ক মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির, আব্দুর রহিম (রিপন)সদস্য সচব মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির, আকিদুর রহমান(সোহান) সাধারন-সম্পাদক জেলা ছাত্র দল,আবুমিয়া চৌধুরী
ইয়াসীন সেলিম বলেন-“নৌকাবাইচ গ্রামবাংলার প্রাচীন খেলা। যুগ যুগ ধরে এই খেলা মানুষকে নির্মল আনন্দ দিয়ে আসছে। গ্রামীণ অনেক খেলা আজ হারিয়ে গেছে। এ সময়ে নৌকাবাইচ মানুষের মাঝে আবারও আনন্দ ফিরিয়ে এনেছে। কুশিয়ারার বুকে এই খেলা যেন কোনোদিন থেমে না যায়।”সন্ধ্যার অন্ধকার যখন ধীরে ধীরে নেমে আসে, নদীর বুক তখনও মুখরিত বৈঠার ছন্দে। ক্লান্তি নেই মাঝিদের হাতে, নেই দর্শকের চোখে। কুশিয়ারার ঢেউয়ের সঙ্গে যেন মিলেমিশে গেছে গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রাণচাঞ্চল্য। এ এক লোকউৎসব, যেখানে জলের সঙ্গে মিশে গেছে মানুষের আনন্দ, আবেগ আর চিরন্তন বাঙালি সংস্কৃতি।