
পর্যটন কি বর্জ্যই হবে—নাকি বদলাবে নিয়ম? আলতাদিঘীকে ‘জিরো ওয়েস্ট’ ভাবনায় সেরা দশে বেরোবির টিম বিনোভা
লোকমান ফারুক, রংপুর
৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
পর্যটন এলাকা—সাধারণত যেখানে ছবি তোলা, খাবারের মোড়ক আর ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের স্তূপ একসঙ্গে চলে। সেখানেই ভিন্ন এক গল্প বলেছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরের (বেরোবি) একদল তরুণ। ওয়াটারএইড বাংলাদেশ আয়োজিত ব্লু বিজনেস আইডিয়া কম্পিটিশন-এ সারা দেশ থেকে জমা পড়া ৩১৫টি প্রস্তাবের ভিড় পেরিয়ে ‘টিম বিনোভা’ উঠে এসেছে সেরা দশে।
সংখ্যাটি ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু এই দশে জায়গা করে নেওয়ার পেছনে যে ধারণাটি রয়েছে, তা বড় প্রশ্ন তোলে—আমরা কি উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংসকে মেনে নিয়েছি, নাকি অন্য পথও আছে? টিম বিনোভার প্রস্তাব ছিল নওগাঁ জেলার আলতাদিঘী পর্যটন এলাকাকে ‘জিরো ওয়েস্ট’ টুরিস্ট স্পট হিসেবে গড়ে তোলা। পরিকল্পনাটি কাগজে সীমাবদ্ধ কোনো কল্পনা নয়। স্থানীয় সাঁওতাল সম্প্রদায়ের যুবক ও নারীদের যুক্ত করে বর্জ্য সংগ্রহ, বাছাই ও ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকর কাঠামো দাঁড় করানোর কথা বলা হয়েছে এতে। পরিবেশ রক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক মর্যাদা—তিনটি বিষয়কে একই সুতোয় গাঁথার চেষ্টা।
এই আইডিয়ার পেছনের মানুষগুলো নতুন নন। টিমের সব সদস্য—নুর হাশেম বাঁধন, জামিলুর রেজা সিফাত, মুশফিকা আরা, সাইয়েদা তাসনিম ও নাফিসা আক্তার—দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক সংগঠন এরাইজ ইয়ুথ ফাউন্ডেশন-এর সঙ্গে যুক্ত। পরিবেশ সংরক্ষণ, যুব ক্ষমতায়ন আর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তবতার সঙ্গে তাদের পরিচয় মাঠ থেকেই।
একজন সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকের ভাষায়,”এই প্রস্তাবের শক্তি এখানেই—এটা বাইরের কেউ এসে কী করা উচিত বলছে না। যারা এলাকায় কাজ করেছে, তারাই সমাধান দেখাচ্ছে।”
প্রতিযোগিতা শেষে টিমের সদস্য মুশফিকা আরা বলেন, “আমরা শুধু আইডিয়া দিতে চাইনি। আমরা যা দেখেছি, যাদের সঙ্গে কাজ করেছি, সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এই পরিকল্পনা এসেছে। স্বীকৃতিটা আমাদের দায়িত্ব আরও বাড়িয়েছে।” তার কণ্ঠে ছিল না কোনো অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস বরং দায়িত্বের ভার।
টিম বিনোভার লক্ষ্য, আলতাদিঘীকে এমন একটি মডেল হিসেবে দাঁড় করানো, যেখানে পর্যটন মানেই বর্জ্য নয়, বরং শৃঙ্খলা ও অংশীদারিত্ব। যেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সহায়তার বস্তু নয়, বরং পরিবর্তনের চালিকাশক্তি।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই স্বীকৃতি কি কেবল মঞ্চের আলোতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি নীতিনির্ধারক ও স্থানীয় প্রশাসন এমন উদ্যোগকে বাস্তবে রূপ দিতে পাশে দাঁড়াবে?
পর্যটনের নামে আমরা যে বর্জ্য রেখে যাচ্ছি, তার দায় কে নেবে—আর এই তরুণদের দেখানো পথ কি সত্যিই অনুসরণ করা হবে?