লোকমান ফারুক, রংপুর
২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
রাত নেমেছে, কাউনিয়ার মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে মাইক থেকে ভেসে আসা শব্দ ভেঙে দিচ্ছে শীতের স্থবিরতা। আলো-ছায়ার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে মানুষ, কেউ চুপ, কেউ হাততালি দিচ্ছে, কেউবা শুধু শুনছে। রাজনীতির মাঠে এই শোনাটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
মঞ্চে উঠে জাতীয় নাগরিক পার্টির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ সরাসরি কথায় গেলেন। কোনো ভূমিকা নেই, কোনো ঘুরপথ নেই। “১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় পার্টির জানাজা ও দাফন হবে,” বললেন তিনি।
কথাটা রূপক, কিন্তু ইঙ্গিতটা নির্মমভাবে স্পষ্ট। তাঁর ভাষায়, জাতীয় পার্টি ইতোমধ্যেই মৃত-আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দোসর। গণভোটের দিনে সেই “মৃতদেহের” আনুষ্ঠানিক দাফন সম্পন্ন হবে।
তিনি অভিযোগ করলেন, ভারতের রাজনৈতিক দলের বাংলাদেশ শাখা হিসেবে জাতীয় পার্টি ‘না’ ভোটের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। ‘পরিতাপের বিষয়,’ “বাংলাদেশের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল যখন ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে, তখন তারা উল্টো পথে। মাঠে থাকা মানুষের ভেতর থেকে চাপা আওয়াজ আসে। কেউ কেউ মাথা নেড়ে সমর্থন জানায়।
হাসনাত আবদুল্লাহ এরপর আঙুল তুললেন বিএনপির দিকে। ভাষা আরও তীক্ষ্ণ হলো। “ওপেনে হ্যাঁ, গোপনে না-এই খেলা বন্ধ করতে হবে, বললেন তিনি। “জনতার কাতারে নেমে এসে মুখে যে হ্যাঁ বলেছেন, সেই হ্যাঁ-কে জিতিয়ে আনতে হবে। তিনি উদাহরণ টানলেন-তারেক জিয়া, নাহিদ ইসলাম, ডা. শফিকুর রহমানের। তাঁদের অবস্থান ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে। তার বিপরীতে জাতীয় পার্টিকে তিনি আবারও আলাদা করে দেখালেন।
এরপর এল সবচেয়ে বাস্তব কথাগুলো। রাজনীতির সেই পুরোনো লেনদেনের প্রসঙ্গ। “ভোটের আগের দিন মুড়ি, শাড়ি, অ্যাডভান্স টাকা নিয়ে আসবে। “১২ তারিখ সেগুলো প্রত্যাখ্যান করবেন। তারপর যোগ করলেন-
“এই একদিনের ভুল আপনাদের আগামী পাঁচ বছর ভোগাবে।
নিজেদের সীমাবদ্ধতাও স্বীকার করলেন। “আমরা লুঙ্গি-শাড়ি আনতে পারব না, স্কুল ব্যাগ আনতে পারব না, আপনি আমাদের জন্য ১০ দিন খাটেন, আমরা আগামী পাঁচ বছর আপনার জন্য গোলাম হয়ে থাকব।
এরপর মাইকের সামনে আসেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ। তাঁর কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু বক্তব্যে হুঁশিয়ারি।
“যাদের কারণে মানুষ নির্যাতিত হয়েছে, তাদের সঙ্গে আবার বন্ধুত্ব করার চেষ্টা চলছে,” বলেন তিনি। “দিল্লির গ্রিন সিগন্যাল নিয়ে ফ্যাসিস্টরা ক্ষমতায় ফেরার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ” জনগণ প্রস্তুত। ভোটাধিকার হরণের চেষ্টা হলে প্রতিরোধ হবে। হোন্ডা নিয়ে মাস্তানি করলে, তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। বিচারের কথাও এল। শাপলা চত্বর, বিডিআর, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান—সব হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে, এমন প্রতিশ্রুতি দিলেন তিনি। বললেন, “৫৪ বছর ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি লুটপাটের শাসন করেছে, আমরা সেই বৃত্ত ভাঙতে চাই।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন রংপুর-৪ আসনের ১১ দলীয় জোট প্রার্থী আখতার হোসেন। মঞ্চে ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা। সবাই একই সুরে কথা বললেন-সংস্কার, সুশাসন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’।
মাঠ ছেড়ে মানুষ যখন ঘরে ফিরছে, তখন প্রশ্নগুলো রয়ে যাচ্ছে। এই ভাষা কি কেবল নির্বাচনী উত্তাপ, নাকি গভীর রাজনৈতিক সংকেত? আর যদি ভোট আবারও অবিশ্বাসের জন্ম দেয়-তাহলে এই মাঠে দেওয়া প্রতিশ্রুতির দায় নেবে কে?