May 19, 2022, 11:19 am

ঝিকরগাছায় রেল ষ্টেশনে চলছে কালো বাজারী বেনাপোল এক্সপ্রেসের টিকেট নিয়ে তেলেসমাতি কান্ড

ঝিকরগাছায় রেল ষ্টেশনে চলছে কালো বাজারী বেনাপোল এক্সপ্রেসের টিকেট নিয়ে তেলেসমাতি কান্ড

বিল্লাল হুসাইন।।

যশোরের ঝিকরগাছা রেলওয়ে স্টেশনে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চেয়ারে সত্যবাদী যুধিষ্ঠি হয়ে বসে আছেন। আর সত্যবাদী যুধিষ্ঠিরদের কাজে যে এতো ঘাপলা রয়েছে সেটা কাছে থেকে না দেখলে বোঝার উপায় নেই! ঢাকা থেকে বেনাপোলে যাওয়া আসার বিষয়ে মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। ঝিকরগাছা থেকে ঢাকা যাতায়াতে বাস সার্ভিসে ফেরিঘাটে সময় বেশি লাগা এবং বিভিন্ন বিড়ম্বনার কারণে বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেন এই অঞ্চালের যাত্রীদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
ঝিকরগাছা থেকে প্রতিদিন প্রায় এক থেকে দেড় হাজার যাত্রী ঢাকা যাতায়াত করে। যার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাত্রীদের যাতায়াতে জন্য ২০১৯ সালের ১৭ জুলাই ৭৯৫-৭৯৬ কোডে একটি ট্রেন সার্ভিস চালু করে। তখন ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তার নিজের পছন্দের নাম হিসেবে “বেনাপোল এক্সপ্রেস “রেখে শুভ উদ্বোধন ঘোষনা করেন। বাংলাদেশ রেলওয়ে সংস্থার পশ্চিমাঞ্চল কতৃক পরিচালিত এই ট্রেনটি বুধবার বাদে সপ্তাহে ৬ দিন ঢাকা থেকে বেনাপোল এবং বেনাপোল থেকে ঢাকা রুটে নিয়মিত চলাচল করে। তখন “বেনাপোল এক্সপ্রেস ” এর জন্য ঝিকরগাছা রেলওয়ে স্টেশনে কোন প্রকার স্টপেজ ছিলো না। প্রথমে এটি একটি বিলাসবহুল ট্রেন থাকলেও করোনাকালীন সময়ে প্রায় দেড় বছর সাময়িক ভাবে বন্ধ থাকার পর পুনরায় যখন ট্রেনটি চালু হয় তখন এর অত্যাধুনিক রেক বদলে পুরোনো রেক দিয়ে চালু করা হয়।
ঝিকরগাছা রেলওয়ে স্টেশনে স্টপেজের দাবিতে ও অত্যাধুনিক রেক বদলে পুরোনো রেক দিয়ে চালু করার প্রতিবাদে স্থানীয় অরাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেবা’র উদ্যোগে যশোর জেলার সর্বস্তরের মানুষ তার প্রতিবাদে রেলওয়ে স্টেশনে মানববন্ধন করেন। স্টপেজের দাবিতে মানববন্ধন করা হলে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দাবিটাকে আমলে নিয়ে ঝিকরগাছা রেলওয়ে স্টেশনে স্টপেজের ব্যবস্থা সহ ৫৫ টি সিট বরাদ্দ দেয়। পরবর্তীতে করোনার পর সিট সংখ্যা কমিয়ে ৪০টি করা হয়, যার ২০টি অনলাইন এবং ২০টি স্টেশন থেকে সরবরাহ করা হয়। ট্রেনে মাত্র ২০টি সিট বরাদ্দ থাকায় এই টিকেট পাওয়ার জন্য এতদাঞ্চলের মানুষ আরামদায়ক ভ্রমনের আশায় প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। আর এই সুযোগটিই গ্রহন করেছে একটি অসাধু চক্র। তারা খুব কৌশলে ট্রেনের টিকেট গুলো নিজেরা সংগ্রহ করে নেয় এবং সুযোগ বুঝে যাত্রীদের কাছে ২গুন থেকে ৩ গুন দামে বিক্রয় করা হয়।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ঝিকরগাছা রেলওয়ে স্টেশন থেকে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ৪ টি টিকিটের বেশি নিতে পারবেনা। তবে গত ৬ ই মে ঢাকা যাওয়ার জন্য আব্দুল খালেক ৬টি টিকিট ক্রয় করেছে। JCG845 নং এ ২টি, JCG846 নংএ ২টি এবং JCG847 নংএ ২টি মোট ছয়টি টিকেট কেটেছেন রেলওয়ে স্টেশনের কাউন্টার থেকে। সেখানে ফোন নং দিয়েছেন ০১৭৩৪৫৮০৫৫৪, আই ডি নং ২৮১৬০৪৯৩০৪। যেহেতু এই ব্যক্তির নামে ৬টি টিকিট বরাদ্দ হয়েছে। যার জন্য কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা যায় এনআইডি কার্ডের ঠিকানায় আব্দুল খালেক নামের কোনো মানুষের অস্তিত্ব নেই। সেখানে আছে নাফিসা নওরিন অন্তরা নামের আর এক ব্যক্তি। ফোন নাম্বারে যোগাযোগ করলে জানা যায় উক্ত নাম্বারটি মাধব নামের একজনের। সৈয়দ নুরুল নামে JCG844 নং এ চারটি টিকেট কাটা হয়েছে। ফোন নং ০১৩১৯৯১৮১৭৫, এনআই ডি নং ৪১২২৩০৯৭৯৮৬৮৮। মোবাইল নাম্বারটি সর্বদা বন্ধ রয়েছে। ১০মে ঢাকা যাওয়ার জন্য মনিরুল ইসলাম, পিতা অজের আলী এবং সুমন হোসেন পিতা মনিরুল, গ্রাম মোবারকপুর নামে দুটি টিকিট কাটা হয়। কিন্তু সমগ্র মোবারকপুর গ্রাম খুজে তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে শম্ভু দাস, বুলু দাস, কাঞ্চন দাসী এই তিনজনের এনআইডি কার্ড দিয়ে তিনটি টিকিট কাটা হয়েছে। অনুসন্ধানে ১১মে এই তিনজনকেই তাদের বাড়িতে পাওয়া গেছে। কিন্তু তারা কেউই ঢাকাতে যায়নি। তাদের নামে টিকিট কাটা হয়েছে এটা সত্য কিন্তু সত্যবাদি যুধিষ্ঠির রেলওয়ে স্টেশনের কাউন্টারে টিকিট পাওয়া না গেলেও নির্দিষ্ট কথিত দালাল ইমদাদুলের নিকট অতিরিক্ত অর্থ দিলেই মেলে সোনার হরিণ নামক বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিট। অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, স্টেশনের চাবিকাঠি থাকার সুবাদে ইমদাদুল স্টেশন কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় খুব সকালে এসে স্টেশন খুলে বিভিন্ন ভুয়া এনআইডি কার্ড ও ফোন নাম্বার ব্যবহার করে ৮-১০ টি টিকিট কেটে নেন। আর যদি সেই সুযোগ না পান তবে তার কয়েকজন সহযোগীকে লাইনে দাড় করিয়ে টিকেট কাটান। পরে ২-৩ গুণ দামে সেই টিকিট ঢাকা গামী যাত্রীর নিকট বিক্রি করে। এই বিষয়ে আরিফুল ইসলাম নামে একব্যক্তি জানান, তিনি ৮শত টাকা দিয়ে ইমদাদুলের নিকট থেকে টিকিট কিনে ঢাকা গেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানান ৬ই মে ঢাকা যাওয়ার জন্য ১হাজর ৮শত টাকা দিয়ে তার কাছ থেকে তিনি দুটি টিকিট নিয়েছেন। এভাবেই রেলওয়ে স্টেশনে বসে স্টেশন কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকেট কালোবাজারি করা হচ্ছে বলে একাধিক অভিযোগ ওঠেছে। যার ফলে সাধারণ মানুষ টিকিট পায় না। নাম প্রকাশ না করার স্বার্থে স্টেশনের আশেপাশের দোকানী এবং বাসিন্দারা জানান, ইমদাদুল স্টেশনের পাশে একটি দর্জির দোকানী। সে সারাদিন খুব ফিটফাট হয়ে রেলওয়ে স্টেশনে ঘুরে ঘুরে খবরদারি করে, কখনো রেলওয়ে স্টেশনে কবুতরের ব্যবসা ও কখনো ফুলের ব্যবসা করতে দেখা যায়। তার মনিব স্থানীয় হওয়ায় এবং স্টেশন মাস্টারের আশীর্বাদ থাকায় কেউ তাকে কিছু বলতে সাহস পায়না। তারা আরও জানান, ইমদাদুলকে দেখে মনে হয় তিনিই রেলওয়ে স্টেশনের কর্তব্যরত মাস্টার। স্টেশনে থাকাকালীন তিনি বেশীরভাগ সময় স্টেশন মাস্টারের রুমেই সময় কাটান। এখন জনসম্মুখে প্রশ্ন চলে আসে নির্দিষ্ট কথিত দালাল ইমদাদুল কে ? কার তত্ত্বাবধানে ইমদাদুল এই কাজ কর্ম পরিচালনা করছে এবং সে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের নিয়োগকৃত না হয়েও তার কাছে কি ভাবে স্টেশনের চাবি কাঠি থাকে এই নিয়ে ২য় পর্বে থাকছে তেলেসমাতি কান্ডের দারুণ চমক।

Facebook Comments Box
Share Button

      এ ক্যাটাগরীর আরও সংবাদ